রাজনৈতিক পালাবদলের ঐতিহাসিক দিনে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ে স্বস্তির ফল দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৭ ফেব্রুয়ারি দিনশেষে দেশের মোট গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে আইএমএফের বিপিএম–৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯.৮৬ বিলিয়ন ডলার — এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
দীর্ঘ ১৮ মাস দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সময়কালের পরে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক সেই দিনেই এই মাইলফলক অর্জন দেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি খবর বলছেন অর্থনীতিবিদরা।
রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার পিছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ব্যাপক প্রবাহ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠিয়েছেন ৩১৭ কোটি ডলারের (প্রায় ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার) সমপরিমাণ অর্থ। ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৬ দিনে দেশে এসেছে আরও ১৮০ কোটি ৭০ লাখ ডলার (প্রায় ১.৮০৭ বিলিয়ন ডলার)। রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি আমদানি চাপ কমাতে এবং মুদ্রাবাজারে সরবরাহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রপ্তানি আয়ে স্থিতিশীলতা বজায় থাকাও রিজার্ভ বাড়ার অন্য একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বর্তমান বাজারে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বাড়ায় মুদ্রাবাজারে সাময়িক ভারসাম্য বদলে গেছে; ব্যাংকগুলোতে ডলারের উদ্বৃত্তও দেখা দিয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ডলারের দর প্রয়োজনের তুলনায় আরো কমে যেতে পারে—এটি রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নিয়মিত ডলার কিনে নিচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে রিজার্ভ বাড়াতে সাহায্য করেছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রায় ৪.৯০ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রিজার্ভের বর্তমান অবস্থা গত কয়েক বছরের সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২২ সালে ডলারের দাম তখনকার প্রায় ৮৫ টাকার স্তর থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়; সেই সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত তিন অর্থবছরে বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের পরে হুন্ডি-সহ অবৈধ অর্থপ্রবাহ রোধে কঠোর তৎপরতা ও নজরদারির ফলে পরিস্থিতি দ্রুত শন্তি পেতে শুরু করে এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়তে শুরু করে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সাড়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের উপরে রিজার্ভ নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় ধরনের এক অর্থনৈতিক সহায়তা হবে। এটি আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের অর্থনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে। মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরলে সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসার ওপর মুদ্রাস্ফীতির চাপও কমানো সম্ভব হবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই সময় রিজার্ভের উল্লম্ফন দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























