০৫:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
বেসরকারি খাতের গতিশীলতায় সুদৃঢ় অর্থনীতি গড়াই সরকারের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী চিফ হুইপ: প্রধানমন্ত্রী জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন ৫০তম বিসিএস লিখিত ফল প্রকাশ: ৬১৬৫ জন উত্তীর্ণ সংসদের চিঠি পেলেই সিদ্ধান্ত: গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে ইসি মাছউদ প্রবাসীদের পাসপোর্ট তথ্য সংশোধনের সময়সীমা ছয় মাস বাড়ল জাতিসংঘে সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি সময় বাড়াতে তথ্যমন্ত্রী: শহীদ জিয়ার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ই অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় একনেকে ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকার আটটি প্রকল্প অনুমোদন একনেকে ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকার ৮টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ম্যানিলায় বাংলাদেশ-চীন কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদারের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক

ঋণের সুদ ও ব্যাংক খাতের ক্ষত: নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ

নতুন সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে, অর্থনৈতিক সংকট এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার বেসরকারি সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের দায়িত্বকাল শেষ হয়েছে। তিনি নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার নোট রেখে গেছেন—যাতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জটিল ও গুরুতর চিত্র পরিষ্কার ভাষায় উপস্থাপিত রয়েছে।

নোটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ থেকে উদ্ভূত চাপ। সার্বিক বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়েছে; সেই ঋণের নিয়মিত সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে অর্থনীতির কর্মক্ষমতা ক্ষয় করছে—এটিই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বলে তিনি বলছেন।

ড. সালেহউদ্দিন সতর্ক করেছেন যে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় দুর্বল এবং শাসনব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। এসব কারণে সরকারি সক্ষমতা কমে এসেছে এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ঝুঁকিভারি কাজ করাটা কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি নতুন সরকারের কাছে পরামর্শ দিয়েছেন—এই মুহূর্তে নতুন কোনো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়ার চেয়ে আগে শুরু করা সংস্কারগুলো জোরদার করা উচিত।

ব্যাংকিং খাতের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)–র গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে নোটে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা অনিয়ম-চুরি ও লুটপাট হয়েছে। বর্তমান মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ খেলাপি, যা ব্যাংকিং কাঠামোর ভিত নড়াচ্ছে। নতুন সরকারের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটি হবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মকানুনের মধ্যে নিয়ে এসে শক্ত প্ল্যান্টফর্ম ও আইনি ভিত্তি তৈরি করা।

নোটে আরও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ও ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করার চেষ্টা করা হলেও খেলাপি ঋণ ও পুঁজি ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংকট মোকাবেলায় পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার ও অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; এ ব্যয় নির্বাহ করতে সরকারকে আনুমানিক ২০ হাজার কোটি টাকার বোঝা বহন করতে হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতিনিয়ন্ত্রণে ড. সালেহউদ্দিনের সময়কাল ছিল চ্যালেঞ্জিং। নানা কঠোর পদক্ষেপ নিলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো অনেকের জন্য ভারী। তবু তিনি খানিক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন—সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে মূল্যস্ফীতি আগামী জুন নাগাদ প্রায় ৭ শতাংশের আশেপাশে নেমে আসতে পারে। সেই লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

রপ্তানি আয় বাড়িয়ে বৈদেশিক খাতকে স্থিতিশীল করা প্রয়োজন—কারণ বর্তমানে রপ্তানির বৃদ্ধির গতি আমদানির তুলনায় কম। রাজস্ব আয় বাড়াতে তিনি ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েস দ্রুত চালুর পরামর্শ দিয়েছেন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)–এর অভ্যন্তরীণ সংস্কারে দৃঢ় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বাজারব্যবস্থায় আস্থা ফেরানো এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন করা নতুন অর্থমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

আগামীকালের প্রথম কার্যদিবসে অর্থ বিভাগের সচিব আনুষ্ঠানিকভাবে এই উত্তরাধিকার নোটটি নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করবেন। এখন সময় এসেছে নোটে থাকা বাস্তবসম্মত সুপারিশগুলো দ্রুত ও দক্ষভাবে কার্যকর করার—নাহলে ঋণের বোঝা ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সারিয়ে অর্থনীতি সচল করা কঠিন হবে। সব মিলিয়ে, ঋণের সুদ ও ব্যাংকিং খাতের ঘাটতি সারিয়ে তোলা হবে নতুন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ও জরুরি কাজ।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

চিফ হুইপ: প্রধানমন্ত্রী জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন

ঋণের সুদ ও ব্যাংক খাতের ক্ষত: নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিতঃ ০৩:২৫:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নতুন সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে, অর্থনৈতিক সংকট এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার বেসরকারি সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের দায়িত্বকাল শেষ হয়েছে। তিনি নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার নোট রেখে গেছেন—যাতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জটিল ও গুরুতর চিত্র পরিষ্কার ভাষায় উপস্থাপিত রয়েছে।

নোটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ থেকে উদ্ভূত চাপ। সার্বিক বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়েছে; সেই ঋণের নিয়মিত সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে অর্থনীতির কর্মক্ষমতা ক্ষয় করছে—এটিই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বলে তিনি বলছেন।

ড. সালেহউদ্দিন সতর্ক করেছেন যে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় দুর্বল এবং শাসনব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। এসব কারণে সরকারি সক্ষমতা কমে এসেছে এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ঝুঁকিভারি কাজ করাটা কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি নতুন সরকারের কাছে পরামর্শ দিয়েছেন—এই মুহূর্তে নতুন কোনো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়ার চেয়ে আগে শুরু করা সংস্কারগুলো জোরদার করা উচিত।

ব্যাংকিং খাতের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)–র গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে নোটে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা অনিয়ম-চুরি ও লুটপাট হয়েছে। বর্তমান মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ খেলাপি, যা ব্যাংকিং কাঠামোর ভিত নড়াচ্ছে। নতুন সরকারের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটি হবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মকানুনের মধ্যে নিয়ে এসে শক্ত প্ল্যান্টফর্ম ও আইনি ভিত্তি তৈরি করা।

নোটে আরও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ও ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করার চেষ্টা করা হলেও খেলাপি ঋণ ও পুঁজি ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংকট মোকাবেলায় পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার ও অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; এ ব্যয় নির্বাহ করতে সরকারকে আনুমানিক ২০ হাজার কোটি টাকার বোঝা বহন করতে হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতিনিয়ন্ত্রণে ড. সালেহউদ্দিনের সময়কাল ছিল চ্যালেঞ্জিং। নানা কঠোর পদক্ষেপ নিলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো অনেকের জন্য ভারী। তবু তিনি খানিক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন—সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে মূল্যস্ফীতি আগামী জুন নাগাদ প্রায় ৭ শতাংশের আশেপাশে নেমে আসতে পারে। সেই লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

রপ্তানি আয় বাড়িয়ে বৈদেশিক খাতকে স্থিতিশীল করা প্রয়োজন—কারণ বর্তমানে রপ্তানির বৃদ্ধির গতি আমদানির তুলনায় কম। রাজস্ব আয় বাড়াতে তিনি ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েস দ্রুত চালুর পরামর্শ দিয়েছেন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)–এর অভ্যন্তরীণ সংস্কারে দৃঢ় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বাজারব্যবস্থায় আস্থা ফেরানো এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন করা নতুন অর্থমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

আগামীকালের প্রথম কার্যদিবসে অর্থ বিভাগের সচিব আনুষ্ঠানিকভাবে এই উত্তরাধিকার নোটটি নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করবেন। এখন সময় এসেছে নোটে থাকা বাস্তবসম্মত সুপারিশগুলো দ্রুত ও দক্ষভাবে কার্যকর করার—নাহলে ঋণের বোঝা ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সারিয়ে অর্থনীতি সচল করা কঠিন হবে। সব মিলিয়ে, ঋণের সুদ ও ব্যাংকিং খাতের ঘাটতি সারিয়ে তোলা হবে নতুন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ও জরুরি কাজ।