সমালোচকদের প্রশংসিত পরিচালক অনুভব সিনহা নতুন সিনেমা ‘অসসি’তে ভারতের সামাজিক বাস্তবতার এক অন্ধকার দিক সুচিত্রভাবে উন্মোচন করেছেন। ২০ ফেব্রুয়ারি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া এই ছবি কেবল বিনোদন নয়; এটি নারীর নিরাপত্তা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার বিরুদ্ধে একটি তীব্র অভিযোগ। দিল্লি-ভিত্তিক এই কাহিনির প্রতিটি দৃশ্যে উঠে এসেছে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, অনাচারের স্বচ্ছলতা এবং বিচারহীনতার করুণ ছবি। ছবির শিরোনাম ‘অসসি’ (আশি) শব্দটির ইঙ্গিতটি—ভারতে প্রতিবিধানে যতটা শোনা যায় তার তুলনায় প্রতিদিন সাড়ে-সত্তরটির কাছাকাছি ধর্ষণের সংখ্যা—বন্ধুমহলকে নাড়া দেয়।
চিত্রনাট্য ঢেলে পাঠানো হয় পরিমা নামের এক স্কুলশিক্ষিকাকে কেন্দ্র করে। দিল্লির এক নির্জন মেট্রো স্টেশনের বাইরে থেকে অপহরণ করে তাকে চলন্ত গাড়িতে অপরাধীরা পাশবিক নির্যাতনের শিকার করে। পরের সকালে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার পর শুরু হয় পরিমার টিকে থাকা ও তার পরিবারের দীর্ঘ বিচারযুদ্ধ। মোহাম্মদ জিশান আইয়ুব অভিনীত বিনয়ের স্ত্রীর প্রতি অটল ভালোবাসা ও ধৈর্য সিনেমার আবেগগত কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর সহনশীলতা ও যত্ন পরিমার শারীরিক-মানসিক পুনরুদ্ধারে এক শক্তিশালী ধারা নিয়ে আসে। অপরদিকে আইনজীবী রাভি (তাপসী পান্নু) লড়াই করেন বিচার পেতে—তাঁর দৃঢ়তা ছবির আইনগত লড়াইকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
আদালতের কয়েকটি দৃশ্য সমাজের জটিল বাস্তবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে: বিত্তশালী অপরাধীদের পরিবারের অর্থ ও প্রভাব মামলার গতিপথ পাল্টাতে কিভাবে প্রয়োগ করা হয়, পুলিশি দুর্নীতি কিভাবে তদন্তকে বিকল করে—এসব নানা স্তরের বাধা ছাপিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হয় ক্ষতবিক্ষত পরিবারকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতার আক্ষেপসমূহ মাঝে মাঝে নীরবে দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়। যখন আইনি প্রক্রিয়া উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে পিছিয়ে পড়ে, তখন কাহিনিতে আসে এক রহস্যময় ছাতাধারী ব্যক্তির আবির্ভাব—নিজের প্রতিশোধ নাকি ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক বিচক্ষণ উপায়, সেটাই ছবির আকর্ষণীয় মোড়গুলোর এক।
অভিনয়শিল্পীরা এই সামাজিক ড্রামার বস্তুনিষ্ঠতা ও আবেগকে শক্তভাবে ধারণ করেছেন। তাপসী পান্নু রাভি চরিত্রে তার তেজোদীপ্ত উপস্থিতি ও দৃঢ় অভিব্যক্তি দিয়ে চরিত্রটিকে প্রাণ দিয়েছেন। কানি কুসরুতির পারফরম্যান্স লাঞ্ছিত নারীর মানসিক যন্ত্রণাকে সূক্ষ্ম ও ভাবগম্ভীরভাবে উপস্থাপন করেছে। কুমুদ মিশ্রা ও মনোজ পাহওয়া যথাযথভাবে নিজেদের রং দেখিয়েছেন। মোহাম্মদ জিশান আইয়ুবের অভিনয় অনুধাবনীয় হলেও অনেক দর্শক মনে করছেন তার চরিত্রটিকে আরও বিস্তৃত করা যেতে পারত। নাসিরুদ্দিন শাহর বিশেষ উপস্থিতি প্রশংসনীয়—তবু তাঁর চরিত্রটি কিছুটা অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছে বলে অনুভব হতে পারে।
পরিচালক অনুভব সিনহা ও চিত্রনাট্যকার গৌরব সোলাঙ্কি বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় গল্পটি গাঁথেছেন; ফলে ছবির প্রতিটি বার্তা আরও জোরালো শোনা যায়। মূলত ছবিটি বলে—যথোপযুক্ত পারিবারিক শিক্ষা, নারীর প্রতি সম্মান ও সামাজিক জবাবদিহিতার অভাবই এমন নিকৃষ্ট পরিস্থিতির জন্ম দেয়। প্রতি ২০ মিনিটে একটি ধর্ষণের ডাটা যখন পর্দায় বারবার ফিরে আসে, দর্শক অস্বস্তিকর এক অস্থিরতায় রেখেই ছবি শেষ হয়।
‘অসসি’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি সমাজের অন্তঃস্থলে থাকা অনভিপ্রেত তন্ত্রকে আঘাত করার এক চেষ্টা—একটি প্রশ্ন ছেড়ে দিয়ে: নারীরা কি কখনো নিঃসংকোচে, নিরাপদে এই সমাজে শ্বাস নিতে পারবে? ছবির সেই না-উত্তর প্রশ্নই দর্শককে রাস্তাঘাটে, পরিবারে ও নিজেদের মধ্যেই একটি দীর্ঘ আলাপ-উন্নীত করতে বাধ্য করে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 

























