বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের আসর শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। বিশেষ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জুরির প্রধান উইম ওয়েন্ডার্সের একজন মন্তব্য, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে সিনেমার মধ্যে রাজনীতি থাকা উচিত নয়। এই মন্তব্যের কারণে সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে, বুকারজয়ী ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতী রায় এই উৎসবে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি, শতাধিক অভিনেতা ও পরিচালক এক খোলা চিঠিতে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন বিরোধী অবস্থান ও নীরবতার প্রতিবাদ জানায়। তবে এই সব বিতর্ককে পেছনে ঠেলে দিয়ে শেষ পর্যন্ত উৎসবের আলোচনায় মূল বিষয় হয়ে ওঠে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
প্রথমে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝাঁজে ভরা এই আয়োজনের মধ্যে, ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা সত্যতা হলো—শেষ পর্যন্ত সিনেমার জয়ে উৎসবের মূল আলোচনায় উঠে আসে রাজনীতি। এবারের আসরে সবচেয়ে বড় পাওয়া স্বর্ণভালুক বা গোল্ডেন বিয়ার জিতেছে জার্মান-তুর্কি নির্মাতা ইলকার চাতাকের সিনেমা ‘ইয়েলো লেটারস’। এরই পাশাপাশি, আরও গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার—গ্র্যান্ড জুরি প্রাইজ—জিতেছে তুর্কি নির্মাতা এমিন আলপার পরিচালিত ‘স্যালভেশন’। এ দুটি সিনেমার মূল কাহিনি একেবারেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত, যা বোঝায় যে, যতই চলচ্চিত্রের নির্মাতারা রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখার চেষ্টা করুক না কেন, আসল অর্থে এই বিষয়টি চলচ্চিত্রের মূল ভিত্তির অধীন।
‘ইয়েলো লেটারস’ সিনেমার গল্পে দেখা যায় তুরস্কের এক আধুনিক ও বামপন্থী দম্পতির জীবন যা রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী দমন-পীড়নের দ্বারা বিপর্যস্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামাটিক আর্টসের প্রফেসর আজিজ এবং তার স্ত্রী, স্বনামধন্য মঞ্চ অভিনেত্রী দরিয়া, একটি নাটকের জন্য একটি গণপ্রদর্শনী শেষে এক শক্তিশালী গভর্নরের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করার পরই জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বৈরাচারী শাসনের রোষে তারা তাদের পেশা ও জীবনযাত্রা হারান। এই সংকটকালীন মুহূর্তে নিজেদের নৈতিকতা ও আদর্শের জন্য তারা সম্মিলিতভাবে লড়াই করে, যা এই সিনেমায় জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে।
৪২ বছর বয়সী এই নির্মাতা ইলকার চাতাকের জন্য এটি এক বিশাল অর্জন। এর আগে তাঁর ‘দ্য টিচার্স লাউঞ্জ’ সিনেমাটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছিল এবং অস্কারের মনোনয়ন লাভ করে। দীর্ঘ ২২ বছর পর, তিনি প্রথমবারের মতো বার্লিনে আসায় এই কাঙালের পুরস্কারটি তাঁর জন্য এক বিরাট সাফল্য। তাঁর আগে ২০০৪ সালে এই সম্মান অর্জন করেছিলেন প্রখ্যাত নির্মাতা ফাতেহ আকিন।
অন্যদিকে, ‘স্যালভেশন’ সিনেমায় উঠে এসেছে এক দূরবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলের নৃশংস গণহত্যার ভয়ঙ্কর চিত্র। এটি ২০০৯ সালে তুরস্কের কুর্দি অঞ্চলে ঘটে যাওয়া যৌথ বাস্তবতা অবলম্বনে নির্মিত। এই সিনেমা দেখায় কীভাবে জাতিগত বিভেদ ও রাজনৈতিক সংকটের মাধ্যমে মানবসমাজে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ও গণহত্যার তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। নির্মাতা এখানে বর্তমান ফিলিস্তিন সংকটের দুঃসময়ও তুলে ধরেছেন। সার্বিকভাবে বলতে গেলে, এবারের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব শুধু সিনেমার শৈল্পিক মানই তুলে ধরেনি; বরং তা প্রতিবাদের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেও ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে নিল।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 




















