দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ, তবে গোপনীয় আলোচনার রেশ ফিরে এসেছে। যুদ্ধবিরতি বা পারমাণবিক ইস্যুতে সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে পর্দার আড়ালে পাকিস্তান মধ্যস্থতায় বার্তা-আদানপ্রদান চলছে এবং তেহরানও তাদের সর্বশেষ প্রস্তাবটি পাকিস্তানের কাছে জমা দিয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়, ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনায় সাফল্য না পাওয়ার পর থেকে পাকিস্তান তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তথ্য ও প্রস্তাব বিনিময় করছে। হোয়াইট হাউস এখন পর্যন্ত ইরানের দেওয়া প্রস্তাবের বিবরণ নিশ্চিত করেনি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘‘গণমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো আলোচনা করবে না’’ এবং শুধু এমন কোনো চুক্তি হবে যা মার্কিন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কি না তা অনিশ্চিত রয়েছে; তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন এবং ইরান ‘‘ইতিমধ্যেই জানে তাদের কী করতে হবে’’। একই সঙ্গে কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ট্রাম্পকে সমর্থন দিলেও কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই ৬০ দিনের কার্যকালের সম্প্রসারণে ব্যাপক সমর্থন আশা করা যাচ্ছে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিস্তৃত কূটনৈতিক সফর ও ফোনালাপে ব্যস্ত ছিলেন। পাকিস্তান, ওমান, রাশিয়া ছাড়াও কাতার, সৌদি আরব, মিসর ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছেন। ইসলামাবাদে দুই দফা সফরের সময় আরাগচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন; এরপর মাসকটেও তিনি যান এবং পরে মস্কোতে রওনা দেন।
আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সাম্প্রতিক আলোচনায় পাকিস্তান ‘‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’’ পালন করেছে। তিনি ছাড়াও আগের দফার আলোচনায় কিছু অগ্রগতি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ‘‘ভুল পন্থা ও অতিরিক্ত দাবি’’ এগুলোকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করেছে বলে উল্লেখ করেছেন। ইসলামাবাদেও সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তারা এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।
ফার্স সংবাদসূত্রে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো বার্তায় তেহরান পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের অনড় অবস্থান তুলে ধরেছে এবং এসব বার্তা ইরানের দিক থেকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি পরিষ্কার করার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফার্সকে আরাগচি ও তার টিমের বার্তাগুলো আইআরজিসিসি-র কাছাকাছি সূত্রের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়।
আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া মিশ্র: কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল-থানি আরাগচির সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সমুদ্রপথ যেন কোনো চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার না হয় তা নিয়ে সতর্ক করেছেন। সৌদি, কাতার, মিসর ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ঘটনাবস্থার আপডেট গ্রহণ করেছেন এবং ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাসকটে আরাগচির সঙ্গে বৈঠকের পর নৌ চলাচলের স্থায়ী স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থেফার বলেন, এই ঘন ঘন ফোনালাপগুলো কোনো বড় কৌশলগত জোট-পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়; বরং এটি সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত কূটনৈতিক যোগাযোগের লক্ষণ। তার মতে, সরাসরি উচ্চপর্যায়ের সফর না থাকলেও টেলিফোনিক যোগাযোগ দেখাচ্ছে যে পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রাখার ইচ্ছা আছে।
তবে বাস্তব সমঝোতা এখনো দূর: উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের প্রস্তাবে সহজে রাজি হচ্ছে না, কারণ ইরানের দাবি শুধু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় — তারা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের মতো বড় দাবিও তুলে ধরছে। ফলে তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও দৃঢ় সমঝোতা গড়তে এখনও অনেক নুড়ি পাথর রয়েছে।
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব আইজাজ চৌধুরী এ ধরনের গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে আলোচনামাত্রা পরিচালনাকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, এসব কৌশল শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পেশাদার কূটনীতিরই অংশ। বর্তমান প্রচেষ্টা যদি বিন্দুমাত্রও ফলাফল দেয়, তবে তা হবে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের গুরুত্ব ও গোপনীয় কূটনীতির প্রভাবের পরিষ্কার প্রমাণ।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























