বাংলাদেশ এখন বহুমুখী জলবায়ু সংকটের তীব্র প্রভাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর প্রায় ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলারে—যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ০.৪ শতাংশ। পরিমিতি ও নীতি না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
সোমবার (৮ জুন) বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত গোলটেবিলে এই চিত্রটি তুলে ধরা হয়। ‘‘জলবায়ু সংকট ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ: টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা’’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ (এনএজেটিবি)।
বক্তৃতায় বিএলএফ প্রোগ্রাম অফিসার মো. জুবায়ের আলম জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও তীব্র তাপপ্রবাহের মুখে পড়ে; কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০২৬ সালেও অধিকাংশ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রির ওপরে বিরাজ করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) আগামী জুন-আগস্টে ৮০ শতাংশ সম্ভাবনায় এল নিনো পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আলোচনায় বলা হয়, তীব্র গরম, বিদ্যুৎ সংকট ও অপরিকল্পিত নগরায়নের সমন্বয়ে শ্রমজীবী মানুষ পানিশূন্যতা ও অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে হিট স্ট্রোক, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া, কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে নারীদের পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষমতা ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বক্তারা আরও বললেন, জলবায়ু পরিবর্তন ধীরে ধীরে শ্রমবাজারের কাঠামো ও কাজের طبيعتই বদলে দিচ্ছে। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি), জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে শ্রমনীতি ও ক্লাইমেট অ্যাকশনকে সমন্বয় করা অনিবার্য। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও অভিযোজনে বিশেষ নজর দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের সভাপতি সৈয়দ সুলতান উদ্দিন, প্রধান সমন্বয়ক এন আহম্মদ, ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশের সমন্বয়ক নুরুল আমিন, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) কুতুবুদ্দিন আহমেদ, ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) আবুল কালাম আজাদ এবং ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান।
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন বলেন, দেশের শিল্পনীতি এখনও মূলত উৎপাদনকেন্দ্রিক, ফলে শ্রমিকরা জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার বাইরে পড়ে যাচ্ছে। ইয়ুথনেট গ্লোবালের সোহানুর রহমান বলেন, তরুণ প্রজন্মই এই সংকট ও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার—দুইয়েরই উত্তরাধিকারী; তাই সবুজ কর্মসংস্থান, ক্লাইমেট-সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মস্থলে তাপ সুরক্ষায় বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
জরুরি সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল—কর্মস্থলে তাপশূল্ক ও নিরাপত্তা বিধি প্রণয়ন, শ্রমনীতি ও শিল্পনীতিতে ক্লাইমেট অভিযোজনকে অন্তর্ভুক্ত করা, নবায়নযোগ্য শক্তিতে ত্বরান্বিত বিনিয়োগ, সবুজ ও দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ চালানো এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা। বক্তারা বলেন, এসব পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রগতি জলবায়ু ঝুঁকিতে স্থবির হয়ে পড়বে।
সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা সরকার, নীতি নির্ধারক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শ্রম সংগঠনকে একযোগে কাজ করে দ্রুত ও ন্যায্য ট্রানজিশনের পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানান—যাতে কর্মঘণ্টা ও কর্মসংস্থানের ক্ষতি কমিয়ে দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























