২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধে পাওয়া পাঠ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক শিল্প ও যুদ্ধে মোড় ঘুরিয়েছে। লক্ষ করা গেছে কিভাবে কম খরচে তৈরি চালকহীন বা আত্মঘাতী ড্রোনগুলো আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রচুর আর্থিক ও কার্যগত চাপ সৃষ্টি করেছে। অতীতে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো উচ্চ প্রযুক্তির ফাইটার জেট এবং দামী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শিল্পায়ন করে নিজ-রক্ষা নিশ্চিত করলেও, বর্তমান বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
ইরান বনাম ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত থেকে দুটি বড় শিক্ষা উঠে এসেছে—এক, আত্মঘাতী ড্রোনগুলো সহজেই শত্রুর আকাশসীমায় ঢুকে যেতে পারে; এবং দুই, এসব সস্তা ড্রোনকে রোধ করতে ব্যবহার করা ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর মিসাইল সামরিক বাজেটকে দ্রুত নিংড়ে নেয়। ফলে যুদ্ধের আর্থিক সমীকরণ বদলে গেছে: ড্রোনের মূল্য কম হওয়ায় ও মূল্যবান প্রতিরক্ষামূলক গোলাবারুদ ব্যয় বাড়ায় আক্রমণাত্মক সামর্থ্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী করে তুলেছে।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের জন্য এখন প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে এসব আত্মঘাতী ড্রোনের বিস্তার। উদাহরণস্বরূপ, প্রত্যেকটি শাহেদ ধাঁচের ড্রোনের আনুমানিক খরচ ২০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার ডলার পর্যন্ত, অথচ এগুলোকে ধ্বংস করতে যে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয় তার খরচ ড্রোনের তুলনায় বহু গুণ বেশি। এই বাস্তবতার প্রভাবেই অঞ্চলের প্রতিরক্ষা নীতিগুলো পুনর্মূল্যায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটেই সৌদি আরব নিজস্ব ‘শাহেদ-স্টাইল’ আত্মঘাতী ড্রোন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। রিয়াদ এই প্রকল্পকে কেবল প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক প্রতিহিংসার মোকাবিলায় একটি আক্রমণাত্মক সক্ষমতা হিসেবে দেখছে। প্রকল্পের নাম ‘স্কাইওয়াস্প’—একটি ওয়ান-ওয়ে বা সম্পূর্ণ আত্মঘাতী ড্রোন, যা মূলত দেশীয় শিল্প ও কৌশলগত প্রয়োজন মিটিয়ে আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সামর্থ্য রাখে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহভিত্তিক ভেক্টর ডিফেন্সের অংশগ্রহণে নির্মিত এই ড্রোনের পাল্লা প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার। এর প্রি-প্রোগ্রামড নেভিগেশন আর্কিটেকচার ড্রোনটিকে উচ্চ মাত্রায় স্বায়ত্তশাসিত মিশন পরিচালনার ক্ষমতা দেয় এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। প্রকল্পে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও নকশায় মার্কিন কৌশলগত দক্ষতা, সৌদির শিল্প সক্ষমতা ও ইরানের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাওয়া শিক্ষা একত্রিত হয়েছে।
স্কাইওয়াস্পের উৎপাদনের জন্য রিয়াদের নিকটবর্তী এলাকায় একটি নিবেদিত কারখানা নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ড্রোনের উৎপাদন কার্যক্রম চালু রয়েছে SR-2 ভিক্টর ডিফেন্স নামের একটি যৌথ উদ্যোগের আওতায়, যেখানে মার্কিন ভেক্টর ডিফেন্স ও সৌদিভিত্তিক এসআর-২ ডিফেন্স সিস্টেমস অংশীদার। এই পদক্ষেপ সৌদি সরকারের উদ্ভাবনী মনোভাব এবং সংকটকালীন সময়ে বিদেশি সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে।
স্কাইওয়াস্প প্রকল্প সৌদি আরবের ভিশন 2030-র লক্ষ্যগুলোর সাথে সরাসরি সুসংগত—দেশটি দশকের শেষে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয়করণ করতে চায়। ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমা সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ঘরের ভিতরে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরিতে বিশাল গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
এই উদ্যোগটি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান ড্রোন প্রতিযোগিতার অংশ মাত্র; সংযুক্ত আরব আমিরাতও একইভাবে নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে। সামগ্রিকভাবে সৌদি আরবের কৌশল বহুমুখী—দেশটি শুধু আক্রমণাত্মক ড্রোন তৈরি করছে না, একই সাথে ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তি উন্নয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেই ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিবর্তন দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক সংঘাতের শিক্ষা কত দ্রুত স্থায়ী শিল্প সক্ষমতায় রূপ নিচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 






















