কৌশলগতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থা বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। ওই সরু নৌপথে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সার বাণিজ্যের একটি বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলস্বরূপ তেলের সরবরাহ-চাহিদার ব্যবধান বড় হয়েছে—ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ইউরোপীয় গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ও ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী জাহাজের জ্বালানি খরচ ইতিমধ্যেই প্রায় ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কাকে তীব্র করছে।
এই অস্থিরতার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে পূর্বাভাসে বড় ধরনের সংশোধন ঘটিয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) জানায়, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.১ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসতে পারে এবং এতে অন্তত ৭০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস ২০২৬ সালের জন্য বিশ্ব প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২.৪ শতাংশে সীমিত করেছে। একই সময়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তি চালিত প্রযুক্তি খাতে শক্তিশালী বিনিয়োগ কিছুটা সান্ত্বনা দিলেও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন অর্থনীতিতে চাপ কমাতে অপর্যাপ্ত বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ফিচের বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য প্রবাহ আগামী জুলাইয়ের আগে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এই বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা—এসব দূরবর্তী সংঘাতও এখানে কাঁচামালের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যাহত করে ফেলেছে। দেশে পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজারে এখন তৎপরতা ও অনিশ্চয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাহাজে হামলা, রুট পরিবর্তন ও ডলারের অস্থিতিশীলতার কারণে তাঁরা এখন উপার্জন ও নগদ প্রবাহ নিয়ে চিন্তিত। লোকসান এড়াতে আমদানিকারকরা অতিরিক্ত মজুত না করে প্রয়োজনভিত্তিক আমদানি করছেন এবং অনেকে খোলা ক্রেডিটে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক শিপিং রুট পরিবর্তনের ফলে পণ্য পৌঁছানোর সময় প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় বাজারদর বাড়ার এক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের ফলেও বাংলাদেশের ঘাটতি বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল পর্যন্ত বাণিজ্যঘাটতি ২২.২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে—গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। এই সময়ে দেশে মোট ৫৮.২২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হলেও রফতানি আয় মাত্র ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছিল। আমদানির তুলনায় রফতানি না বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসহ বেশিরভাগ পণ্যের দাম বাড়ায় ঘাটতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে কিছু ধনাত্মক সূচকও রয়েছে। একই সময়ে প্রবাসীরা ২ হাজার ৯৩২ কোটি ডলার (প্রায় ২৯.৩২ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় ১৯.৫ শতাংশ বেশি। বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ বেড়েছে, তবু শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বর্তমানে নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ স্থায়ী ও ঝুঁকিহীন বৈদেশিক প্রবাহ এখনও পর্যাপ্ত নয়।
সমগ্র পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক সংঘাত ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশে একাধিক স্তরে প্রভাব ফেলছে—জ্বালানি ও কাঁচামাল মূল্য বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বাড়া, স্থানীয় ভোগ্যপণ্যের দাম ওঠা ও ব্যবসায়ীদের নগদ প্রবাহ সংকুচিত হওয়া। সেক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের কাছে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি: ভিন্ন উৎস থেকে আমদানি বৈচিত্র্যকরণ, স্টক ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় সহায়ক নীতি, রপ্তানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ ও রেমিট্যান্স ও স্থায়ী বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দিলে সংকট মোকাবেলা করা সহজ হবে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























