টানা পাহাড়ি ঢল ও ঝরঝরে বর্ষণে দেশের বন্যা পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়ে জটিল রূপ নেয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব ও পার্বত্য এলাকায় যেখানে ধীরে ধীরে পানি নামছে, সেখানে উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলে নতুন করে পানিবৃদ্ধির আশঙ্কা বেড়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ৭ জেলায় ৫৯টি উপজেলা সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত। বন্যায় আটকে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার এবং মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জনকে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এ পর্যন্ত ৫৪ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন। কক্সবাজারে পাহাড়ধস ও বন্যার ঘটনায় নিহতের সংখ্যাই সর্বাধিক—৩৩ জন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে অতিভারি বৃষ্টিপাত চলায় আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের অন্তত ১১টিতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি হতে পারে বা বিদ্যমান অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের ৫টি স্টেশনে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব স্টেশন হল—বান্দরবানে সাঙ্গু (বান্দরবান ও দোহাজারী স্টেশন), সুনামগঞ্জের মারকুলি, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর স্টেশন।
পাউবো অনুযায়ী ঝুঁকিতে থাকা জেলা ও অঞ্চলগুলো হলো:
– দক্ষিণ-পূর্ব: ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি
– উত্তর-পূর্ব: সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ
– উত্তর: নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম
একই সময়ে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর সংলগ্ন নিচু এলাকায় এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মনু ও খোয়াই নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে বন্যার পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ৯৫ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে এবং অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হচ্ছে। সতর্কতার কারণে এখনো কোনো কলেরা আক্রান্ত সনাক্ত হয়নি। সরকার উদ্ধারে ও জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়, ত্রাণ বিতরণ, জরুরি চিকিৎসাসেবা, যোগাযোগ পুনরুদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় কাজ করছে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিজিবি কাজ করছে। দুর্গম এলাকায় বিমান ব্যবহারেও খাদ্য ও শুকনো খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি কর্মসূচি চালু থাকলেও মাঠ পর্যায়ে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিযোগ, ত্রাণ পৌঁছানো পর্যাপ্ত নয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সীমিত পরিসরে সহায়তা দিচ্ছে।
কক্সবাজারে পরিস্থিতি: কক্সবাজারের রামু উপজেলায় টানা পাঁচ দিনের পর পানি অনেক জায়গায় কমতে শুরু করেছে। তবু কাদা-কালোতে ভরা ঘরবাড়ি, নষ্ট রান্নার চুলা, জ্বালানির সংকট ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে হাজারো পরিবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের হামিদুল হাসান বলেন, ‘‘চার দিন ঘরে রান্না করতে পারিনি। এখন পানি নামলেও ঘরে কাদা, চুলা নষ্ট ও জ্বালানি নেই—তাই রান্নাও করতে পারছি না। এখনো কোনো ত্রাণ পাইনি।’’ রামুর কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, কাউয়ারখোপ, রাজারকুল, ফতেখাঁরকুল, জোয়ারিয়ানালা ও ঈদগড় ইউনিয়নগুলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত; অনেক স্থানে বাড়ি আংশিক বা পুরোপুরি পানির নিচে, কিছু জায়গায় নদীভাঙনও হয়েছে। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে ত্রাণ পৌঁছে দিতে বিলম্ব হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্তরা দাবি করছেন, প্রতীকী বিতরণের বদলে ইউনিয়নভিত্তিক প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, রান্নার জ্বালানি ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন দ্রুত না নিলে মানবিক বিপর্যয় গভীরতর হবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার: হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত আছে। আনুমানিক ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে এবং বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র ঘাটতির সম্মুখীন। প্রাথমিক হিসেবে মৎস্য খাতে ক্ষতি প্রায় ৮০–৯০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। মৌলভীবাজারে পানি ধীরে ধীরে নামছে; তবু রাজনগরসহ কয়েকটি ইউনিয়নে অনেক গ্রামের রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত এবং পানি দ্রুত নামার কারণে পরিস্থিতি ধীরগতিতে স্বাভাবিক হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চল ও তিস্তা–দুধকুমার: উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোও রক্ষায় নয়—তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের পরিস্থিতি শঙ্কাজনক। পরবর্তী ২৪–৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামে তিস্তা ও দুধকুমারের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। কুড়িগ্রামে ধরলা নদী ও গাইবান্ধায় তিস্তা সতর্কসীমায় আছে; নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলো যে কোনো মুহূর্তে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ: নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী ও উপদাখালি নদীর পানি বিপৎসীমার অনেকাংশে ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যাদুকাটা, ভুগাই ও কংস নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে; ফলে নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা দ্রুত প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হলে খাদ্যসঙ্কট ও কৃষির ক্ষতিও বাড়তে পারে—টানা বৃষ্টিতে আমনের বীজতলা তৈরি না হওয়া তারই ইঙ্গিত।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া: রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে তাৎক্ষণিক ত্রাণ দিচ্ছে এবং জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা করে ধাপে ধাপে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।
অবস্থা সামলাতে আর্থিক সহায়তা, পরিষ্কার পানি ও স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক তালিকাভুক্ত করে লক্ষ্যভিত্তিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা নদীপানি ও পার্শবর্তী দেশের বৃষ্টিপাত বিবেচনায় নিয়ে সামগ্রিক প্রস্তুতি আরও জোরদারে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 

























