টেকনাফের বাহারছড়ার জুম্মাপাড়া ও আশেপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই অপহরণ ও সশস্ত্র উত্যক্ততার কারণে জনজীবন স্তব্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলভাগে গোষ্ঠীভিত্তিক সন্ত্রাস, মুক্তিপণ আদায় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া ঘটনার ফলে অন্তত দুই শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, ২৮ জুন প্রকাশ্য দিনে পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। আট দিন পর দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তিনি মুক্তি পান; তবে অপহরণের পরে নির্যাতনের কারণে তিনি এখনও অসুস্থ। এরপর ১৭ জুলাই দুপুরে কচ্ছপিয়া-জুম্মাপাড়ার পাদদেশে মহিষ আনতে গেলে ১২ বছর বয়সী আরাফাতকে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা এবং পরে চার লাখ টাকা চাওয়ার বদলে চার লাখ টাকা দেয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়।
অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এলাকার বাসিন্দারা। জুম্মাপাড়া এলাকার খালেদা বেগম বলেন, ২৮ জুন রাত ১১টার দিকে বাড়ির উঠানে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ শুরু হয়, আধা ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গুলি হয়, পরে কেউ দরজায় গুলি করে চড়াও হয়ে দরজায় লাথিও মারে। ভয়ে তিনি ও তার মেয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়। অন্যরা বলেন, রাতে প্রায়ই সশস্ত্র লোকজন এসে গুলি চালায়, দরজা ভাঙে, লুটপাট চালায় — এই সব আতঙ্কে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বহু পরিবার।
একজন কওয়ারি পরিবার সদস্য ইমরান জানিয়েছে, গত মে মাসে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিবারের দেয়া দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে তাকে ছাড়া করা হয়। তিনি বলছেন, অপহরণকারীরা উদ্ধার বললে অভিযান চালানো চরিত্রেই তাদের ওপর আরও নির্যাতন জুড়ে দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী অপহরণকারী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম নেতৃত্বে রয়েছে রেদওয়ান (২৭)। স্থানীয়দের বরাতসব বলে, তার পিতা আব্দুল মালেক ছিলেন এলাকায় পরিচিত ডাকাত; ২০০৬ সালে এক মামলায় গ্রেফতার হয়ে পুলিশের গাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। পরে রেদওয়ান ওই অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন বলে তারা দাবি করেন।
স্থানীয়রা আরো জানায়, অপহরণে রোহিঙ্গা ও বাঙালি মিলিয়ে অন্তত তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয়—রেদওয়ান গ্রুপ, বুলেট গ্রুপ ও আবুল গ্রুপ। এই গোষ্ঠীগুলো পাহাড়ি আশ্রয়ে পাঠিয়ে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। অভিযুক্তদের তালিকায় পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে বেশ কিছু নাম এসেছে। পুলিশ বলেছে, অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টেকনাফ ও পাশবতীয় এলাকায় একায়ে প্রায় ২৯৫ জন অপহরণের শিকার হয়; চলতি বছর ইতোমধ্যে অন্তত ২০টি অপহরণ হয়েছে। এছাড়া হত্যা ও সশস্ত্র সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ এলাকায় পুলিশ পৌঁছতে প্রায় আধাঘণ্টা সময় লাগে; সেই ফাঁকেই অপহরণকারীরা তাদের কাজ সারছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
প্রতিবেশী অভিভাবক ও ইউপি সদস্যরা দ্রুত যৌথ অভিযান ও স্থায়ী পুলিশ চৌকির দাবি জানিয়েছেন। গত ৪ জুলাই জেলা-উপজেলার শীর্ষ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশগ্রহণে বিশেষ কমিটির সভায় অপহরণপ্রবণ এলাকায় চৌকি স্থাপন ও যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, টেকনাফ প্রশাসন ও জেলার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং টহল জোরদার করা হবে। তবে টানা বৃষ্টিসহ বাস্তবগত কারণে যৌথ অভিযানের সময়ক্ষেপণ হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
স্থানীয়রা আশা করছেন যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়া পরিবারগুলো দ্রুত ফিরে আসবে। ইউপি সদস্য ইলিয়াস এবং ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলছেন, অপহরণকারী গোষ্ঠীর আস্তানা ভেঙে দিতে দ্রুত যৌথ অভিযান জরুরি। টেকনাফ-উখিয়া আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীও টেকনাফকে নিরাপদ করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় initiatives দ্রুত বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
এ মুহূর্তে এলাকাবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় দাবি হচ্ছে বাস্তব নিরাপত্তা—নিয়মিত টহল, দ্রুত ও সংকীর্ণ এলাকায় চৌকি এবং অভিযানের মাধ্যমে অপহরণকারীদের গ্রেপ্তার। যত দিন না সেই ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তত দিন বহু পরিবার পাহাড়ের ছায়ায় আতঙ্কে জীবনযাপন ও বসবাস থেকে বঞ্চিত থাকবেন।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























