ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা নিয়ে সরাসরি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানে আলোচনার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিলেও মাঝসমুদ্রে একটি ইরানি কার্গো জাহাজ আটক নিয়ে পরিস্থিতি উষ্মা পেয়েছে, যা আলোচনার সাফল্যের উপর গভীর ঝুঁকি তৈরি করছে।
মার্কিন বাহিনী জাহাজটি আটক করার পর ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ বাড়ে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আমিন সাইক্যালের ভাষ্য, এমন ধরনের পদক্ষেপ সহজেই উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং আলোচনার ইতিবাচক সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। আল জাজিরাকে তিনি বলেছিলেন, দুই পক্ষই যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চায়, তবে এখনই এমন কোনো কর্ম এড়িয়ে চলা উচিত যা সংঘাতকে নতুনভাবে উস্কে দিতে পারে।
সাইক্যাল আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প সংকট মিটাতে আগ্রাহী বলে দাবি করলেও একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকিও দিচ্ছেন—এই দ্বৈত অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। তার ধারণা, যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় উভয় পক্ষের উপর চাপ বাড়ছে এবং হরমুজ প্রণালী ইরানের বিশিষ্ট প্রতিরোধক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
তবে তেহরান থেকে হার্দ অবস্থানের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার ঘোষণা করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা করার পরিকল্পনা নেই। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঈসমাইল বাঘেই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে; তারা নৌ-অবরোধ বহাল রেখেছে এবং আলোচনার সময়েও হামলা চালিয়েছে। বাঘেই দাবি করেন, এই কারণেই তেহরান পাকিস্তানকে বিষয়টি জানিয়েছে।
বাঘেই সতর্ক করে বলেন, যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র নতুনভাবে সংঘাত বাড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত। তিনি স্মরণ করিয়েছেন, প্রথম দফার ইসলামাবাদ বৈঠকে ইরান তাদের ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অনভিপ্রেত আচরণের কারণে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ওই বৈঠকে লেবাননের বিষয়টিও আলোচিত হয়েছিল—ইরান চেয়েছিল লেবাননও যুদ্ধবিরতির আওতায় থাকুক—তবু পরে ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের কঠোর অবস্থানের পরও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান এখনো আলোচনার আশা ধরে রেখেছে। ইসলামাবাদে পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে; তবে ইরানের অচল মনোভাবের কারণে বৈঠক বাস্তবায়িত হবে কি না তা অনিশ্চিত। পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঢুকছে, যেখানে তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা আর ‘অফলপ্রসূ’ সংলাপে অংশ নেবে না।
অপরদিকে ইরানের ভেতরে যুদ্ধে প্রাণহানির সংখ্যা নিয়েও মর্মান্তিক চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইরানের লিগাল মেডিসিন অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৭৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থার প্রধান আব্বাস মাসজেদির মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে এসব মৃত্যু ঘটে; নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এখনও চারটি মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি।
মাসজেদি বলেন, ব্যবহৃত বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্রতার কারণে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০ শতাংশ মরদেহ শনাক্ত করা যাচ্ছিল না; পরে বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরা শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তিনি আরও জানান, নিহতদের বড় অংশই সাধারণ মানুষ—শিশু, বৃদ্ধ ও বেসামরিক কর্মরতরা। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শারজাহ তায়্যেবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলাকে তিনি হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছেন এবং ওই ঘটনায় ১৬৮ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বলেছেন।
সংক্ষিপ্তভাবে, এই সঙ্কট কেবল পারস্পরিক আক্রমণ-প্রতিস্বরূপেই সীমাবদ্ধ নেই; কূটনৈতিক মঞ্চে আলোচনার সম্ভাব্যতা এখন বড় ধরণের প্রশ্নবিদ্ধ। ইসলামাবাদে যে প্রস্তুতি চলছে, তাতেও আলোচনার ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে — ফলে অঞ্চলে সম্ভাব্য উত্তেজনা চরমে পৌঁছতে পারে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























