অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অপারেশনাল প্ল্যান বাতিল ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলেই দেশের স্বাস্থ্যখাতে টিকার চাহিদা ও যোগান সমন্বয়ের জঘন্য ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে—এই অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন স্তর থেকে। অনেকে এটিকে তখনকার উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের খামখেয়ালিতার ফল বলে ব্যাখ্যা করছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও স্বীকার করেছেন যে পূর্ববর্তী সরকারের অদূরদর্শিতার কারণে দেশে টিকার অভাব দেখা দিয়েছে।
সরকার বলছে, বর্তমানে পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা পদক্ষেপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১০ ধরনের মোট ৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহের জন্য ৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে। আরও ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা এবং ১৫ মাসের বাফার স্টক তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী ৮–১২ মাসের মধ্যে পরিস্থিতি ক্ৰমান্বয়ে সেরে উঠবে।
তবে মাঠে এখনো তীব্র সংকট বিরাজ করছে। আগে ইপিআইসহ নানা জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় কেন্দ্রীয়ভাবে চলে—প্রাইমারি হেলথ কেয়ার, কমিউনিটি হেলথ, পুষ্টি, ডিজিজ কন্ট্রোল, হাসপাতাল সেবা ইত্যাদি। কিন্তু ২০২৫ সালে ওই অপারেশনাল প্ল্যান ছাড়ার ফলে এসব কর্মসূচি থমকে গেছে। ফলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও জলাতঙ্ক টিকা সংগ্রহে বিঘ্ন পড়ে এবং ধাপে ধাপে টিকা সংকট দেখা দেয়।
ক্ষতিগ্রস্তদের কাহিনি মর্মস্পর্শী। খুলনার ছয় বছর বয়সী আশা মনি পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আহত হলে মা আয়শা বেগম বৃহস্পতিবার খুলনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান টিকা দেওয়ার জন্য। কিন্তু হাসপাতালে সরকারি সরবরাহ না থাকায় শতাধিক মানুষের ভিড় থাকলেও টিকা মিলল না; বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে ৮০০ টাকা খরচ করে ভ্যাকসিন কিনে শিশুকে টিকা দিতে হয়েছে।
বগুড়ায়ও একই দশা। দুই মাস আগে পোষা বিড়ালের আঁচড়ে গুরুতর আহত মহিলা উদ্যোক্তা তাহমিনা পারভীন শামলীকে প্রথমে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে, পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়—কিন্তু উভয় জায়গায় টিকা না থাকায় ফিরে আসতে হয়েছে। তিনি বলছেন, অনেক পরিবারে পোষা প্রাণী আছে, কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত টিকা না পেলে পরিবারগুলো ঝুঁকিতে পড়ছে।
হেলথ বেসড ইনস্টিটিউশনগুলোও চাপের মুখে। বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশীদ আলম জানিয়েছেন, সরকারি সিদ্ধান্তে গত ১৫ দিনে হাসপাতালগুলোকে নিজেদের তহবিল থেকে সীমিত পরিমাণ টিকা কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে; সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকার টিকা কেনা যাচ্ছে, যা মোট চাহিদার তুলনায় নগণ্য। নওগাঁ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী, বরিশালসহ বেশ কয়েকটি জেলায় টিকাদান কার্যক্রম প্রয়োজনীয়তার তুলনায় অনেক কম পর্যায়ে চলছে। নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মীর সুফিয়ান বলছেন, যা আছে তা দিয়ে আপাতত চলছে, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলছেন, প্রায় চার মাস ধরেই র্যাবিস ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট রয়েছে; এখন হাসপাতালগুলো নিজেদের উদ্যোগে টিকা কিনে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ইনসেপ্টা ফার্মার সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পেরেছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ শুরু হলে সংকট কিছুটা কেটে যাবে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে জরুরি পদক্ষেপ নিলেও হামের টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় বর্তমানে দিনে ১২০০–১৪০০ রোগীকে টিকা দেয়া হচ্ছে; হাসপাতালটিতে ৩০০টির বেশি ভায়াল পৌঁছে গেছে।
বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করে বলছেন, কুকুর-টিকাদান কার্যক্রমে স্থবিরতা জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোর্থ সেক্টর প্রোগ্রামের মাধ্যমে আগে মানুষ ও কুকুরদের টিকাদানে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করা হয়েছিল; দুই দফা কুকুর টিকাদানের ফলে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি কমেছিল। অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ হওয়ার ফলে পূর্বের বিনিয়োগের ফলাফল ঝুঁকিতে পড়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা এখন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, বলে সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, এখন থেকে কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নয়, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেছেন, ৯ লাখ ডোজ জলাতঙ্ক টিকা কেনার অনুমোদন হয়েছে; আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংকট অনেকটাই শিথিল হবে বলে আশা করা जा করছে।
সংক্ষেপে, টিকা সহজলভ্যতা ফেরাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ের ঘাটতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার শিথিলতা লোকমুখে আতঙ্ক তৈরি করেছে। আক্রান্ত রোগী ও হাসপাতালে তত্ক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও সুসংহত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























