দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব শিল্পপার্ক, ডেটা সেন্টার এবং ইভি (বিদ্যুচালিত গাড়ি) খাতের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের দরকারিও অভূতপূর্বভাবে বাড়ছে। বেইন অ্যান্ড কোম্পানি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড যৌথভাবে প্রকাশিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার সবুজ অর্থনীতি ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এসব খাতে বিদ্যুতের চাহিদা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ টেরাওয়াট ঘণ্টারও বেশি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে অঞ্চলের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি ও শিল্পায়নের দ্রুত বিস্তার নেয়ার একটি পরিষ্কার সংকেত হলেও তা বড় চ্যালেঞ্জও হয়ে উঠেছে বলেই মনে করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন চাহিদা মেটাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এই বিশাল অর্থের অর্ধেকেরও বেশি নির্ধারিত হবে শুধুমাত্র ডেটা সেন্টারের অবকাঠামো উন্নয়নে। অন্য দিকে, বর্তমানে এই অঞ্চলের সবুজ অর্থনীতির বাজারমূল্য প্রায় ২৯ হাজার কোটি ডলার; এবং ধারণা করা হচ্ছে যে চার বছরের মধ্যে তা ৪৩ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাবে। গ্রিডে দীর্ঘসূত্রতা এবং সংযোগের দেরি এড়াতে ডেটা সেন্টার অপারেটররাও এখন অতিরিক্ত অর্থ বা প্রিমিয়াম দিতে ইচ্ছুক হয়ে উঠেছেন।
বিদ্যুৎ ও ইভি খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫৪ হাজার কোটি ডলারের ব্যয় ঘোষণা থাকলেও এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঘোষিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে মাত্র ৬০ শতাংশই সঠিক পথে বাস্তবায়িত হচ্ছে; বাকিগুলো নানা কারণবশত অনিশ্চিত। মূলত নিশ্চয়তার অভাব, পর্যাপ্ত সরকারি নীতিমালা না থাকা এবং বাস্তবায়নের ধীরগতি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়েছে।
এই সব অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গ্রিড বা সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতা। গত পাঁচ বছরে সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৫০–৬০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করে দিতে হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অস্পষ্টতা, সরকারি অনুমোদনের জটিল পদ্ধতি এবং কঠোর গ্রিড সংযোগ নিয়মাবলিই এসব সমস্যার মূল কারণ।
অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের গ্রিড আধুনিকায়নে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি দেখা দেবে, যা ক্ষেত্রভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। প্রতিবেদক এবং বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, গ্রিডকে সমসাময়িক চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে শুধুমাত্র নবায়নযোগ্য খাতই নয়, সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প বৃদ্ধিও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রিপোর্টটি আরও ইঙ্গিত করেছে যে, বিশ্ববাজারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের ফলে অনেক দেশের নীতিনির্ধারকরা এখন পরিবেশ রক্ষার চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যদি গ্রিড আধুনিকায়নের গতি বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দ্রুত না বাড়ায়, তবে দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি সঙ্কট ও বিনিয়োগের বড় বাধার সম্মুখীন হতে হবে।
সমাধানের দিকে তাকালে প্রতিবেদকরা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু বেশি পুঁজি আনাই যথেষ্ট হবে না—দ্রুত ও স্পষ্ট সরকারি নীতিনির্ধারণ, গ্রিড সংযোগ নিয়মের সহজীকরণ এবং দ্রুত বাস্তবায়নই প্রয়োজন। দ্রুত বেড়ে চলা সবুজ চাহিদা মেটাতে কার্যকর নীতি ও শক্তিশালী সঞ্চালন কাঠামোই শেষপর্যন্ত সফল হয়া বা ব্যর্থতার দিনরেখা নির্ধারণ করবে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























