০৭:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
প্রবাসী আয়ের জোয়ারে রিজার্ভে ফের প্রাণ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিবেশীদের নাক গলানো গ্রহণযোগ্য নয়: চিফ হুইপ আগামী ১০ জুলাই ঢামেক পরিদর্শনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুদকের মহাপরিচালক পদে রদবদল: মো. মনিরুল ইসলাম নিয়োগ দুদকের শীর্ষপদে রদবদল: মনিরুল ইসলাম নতুন মহাপরিচালক আগামী ১০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ঢামেক পরিদর্শনে যাচ্ছেন ডেঙ্গু মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা: দেশে বাড়ছে আতঙ্ক ডিজিটাল অর্থনীতির চূড়ান্ত ধাপে বাংলাদেশ: বাধ্যতামূলক ‘বাংলা কিউআর’ কার্যকর সিন্দুক-পাহারা নয়, সাইবার নিরাপত্তা এখন বেশি জরুরি: তথ্যমন্ত্রী বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শ্রদ্ধাভরে শেষ বিদায়

ইরান যুদ্ধ, এআই উত্থান ও ডলারের আধিপত্য — ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্ব অর্থত্বে অস্থির ছয় মাস

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে ছিল অসম্ভব অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডের কঠোর মুদ্রানীতি—এই তিনটি শক্তির সমান্তরালে সংঘর্ষে শেয়ার, মুদ্রা ও পণ্যের বাজার কেঁপে উঠেছে। এশিয়ার আর্থিক খাতে চলা উত্থান-পতনের পেছনের গল্প সামনে এনেছে নিক্কেইসহ অন্যান্য রিপোর্ট।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও তেলের অনিশ্চয়তা

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানভিত্তিক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য রণক্ষেত্রের সংস্পর্শে আসে। তেলের সরবরাহসংক্রান্ত ভীতি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে দাম চড়তে শুরু করে। অন্যতম ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট রুট ‘হরমুজ’ প্রায় বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তেল লাইনের বাইরে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ক্ষেত্রের শুরুর দিকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) তেলের দাম ছিল বারেলপ্রতি 65 ডলার, যুদ্ধের তীব্র সময়ে তা বেড়ে প্রায় 119 ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। ব্রেন্ট ক্রুড এক সময় 126 ডলার ছাড়িয়েছে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আসা অপেক্ষাকৃত শান্তিময় সমঝোতার ফলে দাম আবারও নেমে এসে প্রায় বারেলপ্রতি 70 ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়েছে।

এআই বিপ্লব: প্রযুক্তি খাতের সঞ্চারিত আশা

যুদ্ধের তীব্র আবহাওয়ার মাঝেই এশিয়ার প্রযুক্তি সেক্টর এআই উত্থানের ফল ভোগ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক সেবার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মেমরি চিপ ও সেমিকন্ডাক্টরের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানের নির্মাতারা লাভবান হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার SK Hynix রোম্ভ সময়ের মধ্যে দ্রুত মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে স্যামসাংকে ছাড়িয়ে কেবলমাত্র এক উদাহরণ। জাপানের Kioxia Holdings-ও রেকর্ড মুনাফা করেছে। এসব কারণে কোরিয়ার KOSPI, তাইওয়ানের TAIEX ও জাপানের NIKKEI সূচক প্রথমার্ধে একাধিকবার ঐতিহাসিক উচ্চতা ছুঁয়েছে।

শেয়ারবাজারে মিশ্র চিত্র

প্রযুক্তি খাতের জোয়ার থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে মিশ্রতা বজায় ছিল। বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বদলে যাওয়া এবং ভূ-রাজনীতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে প্রথমার্ধে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় 8,100 কোটি ডলার পরিমাণের বিদেশী বিনিয়োগ বেরিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা পেয়েছে ইন্দোনেশিয়া—তার প্রধান শেয়ারবাজার সূচক 30%-এরও বেশি घटেছে; MSCI-র রেটিং সংশয়ে বিনিয়োগকারীদের ভিড় ও বিক্রির সিদ্ধান্ত তা তিব্র করেছে।

মুদ্রাবাজারে ডলারের আধিপত্য

ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার কমানোর পরিবর্তে বজায় রাখা বা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মার্কিন ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। তার প্রভাব দেখা গেছে এশিয়ার মুদ্রার ওপর। জাপানি ইয়েন 1986 সালের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় পৌঁছায়—প্রতি ডলারে প্রায় 162 ইয়েন। দক্ষিণ কোরিয়ার ওয়ন 17 বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসে। থাইল্যান্ডের বাত, ফিলিপাইনের পেসো ও ইন্দোনেশিয়ানের রুপিয়াহও ডলারের চাপ সামলাতে গিয়ে চাপে পড়ে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রিজার্ভ রক্ষা নিয়ে এশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

স্বর্ণ ও বন্ডবাজারে ওঠা-নামা

অস্থিরতার শুরুর দিকে ‘নিরাপদ উচ্ছ্বাস’ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা তুঙ্গে উঠে ট্রয় আউন্সপ্রতি রেকর্ড 5,500 ডলারের ওপরে গিয়েছিল। তবে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান ও উচ্চ সুদহার স্বর্ণে চাহিদা কিছুটা কমায়; দ্রুতই এর দাম নেমে 4,000 ডলারের নিচে পড়ে, যা অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য চমকপ্রদ। অন্যদিকে, যুদ্ধ ও বড় বাজেট ঘাটতির আশঙ্কায় সরকারী বন্ডের ইল্ড (সুদহার) বেড়ে যায়, ফলে বন্ডবাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়।

সম্ভাব্য পরবর্তী ধাপ: অস্থিরতা অব্যাহত?

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালের পরবর্তী ছয় মাসেও বাজারে অস্থিরতা কাটবে—এমন কোনো নিশ্চিত লক্ষণ মুঠোফোনে নেই। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, এআই খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিমুখ নির্ধারণে ফেডের সিদ্ধান্তই আগামী লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তি হবে। ফলত এশিয়ার দেশগুলোর সামনে মুদ্রার মান রক্ষা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা—এই তিনটি ক্ষেত্রে কঠোর চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রযুক্তির বিজয় রোমন্থন থাকলেও যুদ্ধের ছায়া এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি; তাই বাজারের মনোবল ও নীতিনির্ধারকদের কৌশলই আগামী সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিবেশীদের নাক গলানো গ্রহণযোগ্য নয়: চিফ হুইপ

ইরান যুদ্ধ, এআই উত্থান ও ডলারের আধিপত্য — ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্ব অর্থত্বে অস্থির ছয় মাস

প্রকাশিতঃ ১০:৩৮:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে ছিল অসম্ভব অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডের কঠোর মুদ্রানীতি—এই তিনটি শক্তির সমান্তরালে সংঘর্ষে শেয়ার, মুদ্রা ও পণ্যের বাজার কেঁপে উঠেছে। এশিয়ার আর্থিক খাতে চলা উত্থান-পতনের পেছনের গল্প সামনে এনেছে নিক্কেইসহ অন্যান্য রিপোর্ট।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও তেলের অনিশ্চয়তা

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানভিত্তিক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য রণক্ষেত্রের সংস্পর্শে আসে। তেলের সরবরাহসংক্রান্ত ভীতি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে দাম চড়তে শুরু করে। অন্যতম ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট রুট ‘হরমুজ’ প্রায় বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তেল লাইনের বাইরে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ক্ষেত্রের শুরুর দিকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) তেলের দাম ছিল বারেলপ্রতি 65 ডলার, যুদ্ধের তীব্র সময়ে তা বেড়ে প্রায় 119 ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। ব্রেন্ট ক্রুড এক সময় 126 ডলার ছাড়িয়েছে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আসা অপেক্ষাকৃত শান্তিময় সমঝোতার ফলে দাম আবারও নেমে এসে প্রায় বারেলপ্রতি 70 ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়েছে।

এআই বিপ্লব: প্রযুক্তি খাতের সঞ্চারিত আশা

যুদ্ধের তীব্র আবহাওয়ার মাঝেই এশিয়ার প্রযুক্তি সেক্টর এআই উত্থানের ফল ভোগ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক সেবার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মেমরি চিপ ও সেমিকন্ডাক্টরের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানের নির্মাতারা লাভবান হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার SK Hynix রোম্ভ সময়ের মধ্যে দ্রুত মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে স্যামসাংকে ছাড়িয়ে কেবলমাত্র এক উদাহরণ। জাপানের Kioxia Holdings-ও রেকর্ড মুনাফা করেছে। এসব কারণে কোরিয়ার KOSPI, তাইওয়ানের TAIEX ও জাপানের NIKKEI সূচক প্রথমার্ধে একাধিকবার ঐতিহাসিক উচ্চতা ছুঁয়েছে।

শেয়ারবাজারে মিশ্র চিত্র

প্রযুক্তি খাতের জোয়ার থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে মিশ্রতা বজায় ছিল। বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বদলে যাওয়া এবং ভূ-রাজনীতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে প্রথমার্ধে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় 8,100 কোটি ডলার পরিমাণের বিদেশী বিনিয়োগ বেরিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা পেয়েছে ইন্দোনেশিয়া—তার প্রধান শেয়ারবাজার সূচক 30%-এরও বেশি घटেছে; MSCI-র রেটিং সংশয়ে বিনিয়োগকারীদের ভিড় ও বিক্রির সিদ্ধান্ত তা তিব্র করেছে।

মুদ্রাবাজারে ডলারের আধিপত্য

ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার কমানোর পরিবর্তে বজায় রাখা বা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মার্কিন ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। তার প্রভাব দেখা গেছে এশিয়ার মুদ্রার ওপর। জাপানি ইয়েন 1986 সালের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় পৌঁছায়—প্রতি ডলারে প্রায় 162 ইয়েন। দক্ষিণ কোরিয়ার ওয়ন 17 বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসে। থাইল্যান্ডের বাত, ফিলিপাইনের পেসো ও ইন্দোনেশিয়ানের রুপিয়াহও ডলারের চাপ সামলাতে গিয়ে চাপে পড়ে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রিজার্ভ রক্ষা নিয়ে এশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

স্বর্ণ ও বন্ডবাজারে ওঠা-নামা

অস্থিরতার শুরুর দিকে ‘নিরাপদ উচ্ছ্বাস’ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা তুঙ্গে উঠে ট্রয় আউন্সপ্রতি রেকর্ড 5,500 ডলারের ওপরে গিয়েছিল। তবে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান ও উচ্চ সুদহার স্বর্ণে চাহিদা কিছুটা কমায়; দ্রুতই এর দাম নেমে 4,000 ডলারের নিচে পড়ে, যা অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য চমকপ্রদ। অন্যদিকে, যুদ্ধ ও বড় বাজেট ঘাটতির আশঙ্কায় সরকারী বন্ডের ইল্ড (সুদহার) বেড়ে যায়, ফলে বন্ডবাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়।

সম্ভাব্য পরবর্তী ধাপ: অস্থিরতা অব্যাহত?

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালের পরবর্তী ছয় মাসেও বাজারে অস্থিরতা কাটবে—এমন কোনো নিশ্চিত লক্ষণ মুঠোফোনে নেই। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, এআই খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিমুখ নির্ধারণে ফেডের সিদ্ধান্তই আগামী লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তি হবে। ফলত এশিয়ার দেশগুলোর সামনে মুদ্রার মান রক্ষা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা—এই তিনটি ক্ষেত্রে কঠোর চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রযুক্তির বিজয় রোমন্থন থাকলেও যুদ্ধের ছায়া এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি; তাই বাজারের মনোবল ও নীতিনির্ধারকদের কৌশলই আগামী সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।