০৬:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
সিন্দুক-পাহারা নয়, সাইবার নিরাপত্তা এখন বেশি জরুরি: তথ্যমন্ত্রী বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শ্রদ্ধাভরে শেষ বিদায় সাইবার নিরাপত্তা সিন্দুক পাহারার চেয়ে বেশি জরুরি: তথ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ বিদায় মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন অনন্য বহুমুখী শিল্পী: তথ্যমন্ত্রী নাম বদল বা তৃণমূল—কোনওভাবেই কার্যক্রম চালাতে পারবে না আওয়ামী লীগ: তথ্য উপদেষ্টা সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস — অনলাইন বেটিংয়ে সর্বোচ্চ ৫ কোটি জরিমানা, ১০ বছর কারাদণ্ড ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে: মির্জা ফখরুল জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকায় সমন্বিত উদ্যোগ—১০৮ হটস্পট চিহ্নিত খামেনির শেষকৃত্যে যোগ দিতে তেহরান যাচ্ছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ বিদায়

অশ্রু, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা শেষে তার মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, যেখানে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিককর্মী, শিক্ষার্থী ও সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে সত্যিই এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।

সকালে ৮টা ৫৫ মিনিটে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ বিটিভি প্রাঙ্গণে পৌঁছায়। দীর্ঘদিনের সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা সেখানে এসে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে সেখানে তার প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ ও নাট্যজন ম হানিফের মতো বহু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মরদেহ নেওয়া হলে সেখানে কফিন রাখা হয় ও সর্বস্তরের মানুষের জন্য শ্রদ্ধা নিবেদন চলতে থাকে।

শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা একে একে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান; তাঁদের মধ্যে ছিলেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, ত্রপা মজুমদার, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দীন স্টালিন, বরেণ্য শিল্পী মনিরুল ইসলাম, চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, শারমিন এস. মুরশীদ ও কেরামত মাওলা প্রমুখ।

শুধু ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাব্যঞ্জনেই নয়, বহু সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনও তাদের প্রকাশ্য শ্রদ্ধা জানায়—বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গোলাম মোস্তফা একাডেমি, পাঠশালা (সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যসহ প্রাচ্যনাট, বটতলা, দূরন্ত স্টেশন, বঙ্গরঙ্গ নাট্যদল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।

দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজার জন্য। এরপর তার কর্মস্থল ও প্রিয় স্থান—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে, যেখানে তাকে দাফন করা হয়।

মুস্তাফা মনোয়ার গত সোমবার রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন তিনি ভুগছিলেন।

মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন—তাঁকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শিল্প ও সংস্কৃতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনের নির্দেশ অমান্য করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সম্প্রচারকক্ষে তার সাহসী ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পী বাংলাদেশের পাপেট থিয়েটারকে জনপ্রিয় করেছেন এবং শিশুদের জন্য বহু কালজয়ী টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরি করেছেন। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে সম্মানিত হয়েছিলেন।

তাঁর চলে যাওয়ায় জাতীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গন একটি বড় শূন্যতা অনুভব করছে। শিল্প ও সামাজিক জগতের অনেকেই তাকে স্মরণ করে বলছেন—তার সৃষ্টি, উদ্যম ও সাহসিকতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে থেকে যাবে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শ্রদ্ধাভরে শেষ বিদায়

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ বিদায়

প্রকাশিতঃ ১০:৪০:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

অশ্রু, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা শেষে তার মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, যেখানে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিককর্মী, শিক্ষার্থী ও সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে সত্যিই এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।

সকালে ৮টা ৫৫ মিনিটে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ বিটিভি প্রাঙ্গণে পৌঁছায়। দীর্ঘদিনের সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা সেখানে এসে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে সেখানে তার প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ ও নাট্যজন ম হানিফের মতো বহু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মরদেহ নেওয়া হলে সেখানে কফিন রাখা হয় ও সর্বস্তরের মানুষের জন্য শ্রদ্ধা নিবেদন চলতে থাকে।

শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা একে একে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান; তাঁদের মধ্যে ছিলেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, ত্রপা মজুমদার, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দীন স্টালিন, বরেণ্য শিল্পী মনিরুল ইসলাম, চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, শারমিন এস. মুরশীদ ও কেরামত মাওলা প্রমুখ।

শুধু ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাব্যঞ্জনেই নয়, বহু সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনও তাদের প্রকাশ্য শ্রদ্ধা জানায়—বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গোলাম মোস্তফা একাডেমি, পাঠশালা (সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যসহ প্রাচ্যনাট, বটতলা, দূরন্ত স্টেশন, বঙ্গরঙ্গ নাট্যদল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।

দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজার জন্য। এরপর তার কর্মস্থল ও প্রিয় স্থান—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে, যেখানে তাকে দাফন করা হয়।

মুস্তাফা মনোয়ার গত সোমবার রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন তিনি ভুগছিলেন।

মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন—তাঁকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শিল্প ও সংস্কৃতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনের নির্দেশ অমান্য করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সম্প্রচারকক্ষে তার সাহসী ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পী বাংলাদেশের পাপেট থিয়েটারকে জনপ্রিয় করেছেন এবং শিশুদের জন্য বহু কালজয়ী টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরি করেছেন। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে সম্মানিত হয়েছিলেন।

তাঁর চলে যাওয়ায় জাতীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গন একটি বড় শূন্যতা অনুভব করছে। শিল্প ও সামাজিক জগতের অনেকেই তাকে স্মরণ করে বলছেন—তার সৃষ্টি, উদ্যম ও সাহসিকতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে থেকে যাবে।