বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষত নতুন মূলধন বা নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ এক বছরের ব্যবধানে রীতিমতো ধস খেয়েছে—প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে—যা দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যকে গভীরভাবে ঝুঁকিতে ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে এসে ৪৩.৮৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত বছরের ওই প্রথম তিন মাসে নিট এফডিআই ছিল ৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ডলার।
রিপোর্ট বিশ্লেষণে জানা গেছে, আলোচ্য সময়ে মোট বিদেশি বিনিয়োগের অন্তঃপ্রবাহ (ইনফ্লো) হয়েছে ১১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, যখন বহিঃপ্রবাহ (আউটফ্লো) হয়েছে ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের অভাব—চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে নতুন ইক্যুইটি এসেছে মাত্র ৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে比 ৭০.৩৪ শতাংশ কম। এতেই দেখা যায়, পুনঃবিনিয়োগের তুলনায় নতুন বিনিয়োগ অনেক বেশি কমে গেছে। এছাড়া আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের প্রবাহ প্রায় ৯২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন বিদেশি মূলধন দেশের উৎপাদনশীল ক্ষমতা বাড়ায় এবং নতুন প্রকল্প ও কর্মসংস্থান তৈরিতে বেশি ভূমিকা রাখে। নতুন বিনিয়োগ না আসলে বিদ্যমান সংস্থাগুলোর পুনঃবিনিয়োগ যতই থাকুক, তা সাধারন শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে পুরোদমে কাজ করবে না। যদিও মোট ৬৫ কোটি ৩২ লাখ ডলার পুনঃবিনিয়োগ করা হয়েছে, তবুও নতুন বিনিয়োগ না থাকায় শিল্পায়নের গতি মন্থর হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে বিনিয়োগহ্রাসের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে জাতীয় নির্বাচন-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে চিহ্নিত করেছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা ও মুদ্রাভিত্তিক স্থিতি দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেন। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ের নেতিবাচক মূল্যায়ন, ব্যাংকিং খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং মুনাফা ফেরত পাঠাতে জটিল নিয়মও তাদের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগে গতি ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আঙ্কটাডের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘানা ও উগান্ডার মতো কিছু অপেক্ষাকৃত ছোট অর্থনীতির দেশগুলো ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, করকাঠামোর সরলীকরণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্প্রসারণের মাধ্যমে বেশি বিদেশি মূলধন টানতে পেরেছে। সরকার যদি প্রশাসনিক জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক বাধা ও জ্বালানিসহ মৌলিক অবকাঠামো সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ফিরে পাওয়া কঠিন হবে।
খাতভিত্তিক তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি বিদেশি পুঁজি এসেছে বিদ্যুৎ খাতে—৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। তার পরে বস্ত্র ও পোশাক ও বাণিজ্যিক খাতে বিনিয়োগ দেখা গেছে। বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর, সেখান থেকে মোট নিট এফডিআইয়ের ১৮ শতাংশ এসেছে। হংকং, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য পরে অবস্থান করছে। বিশেষভাবে হতাশাজনক হচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ইজেড) বিনিয়োগ—মাত্র ৪২ লাখ ডলার রেকর্ড হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকট কাটাতে কেবল নগদ প্রণোদনা কেবল পর্যাপ্ত নয়। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে দরকার ফিনানশিয়াল সেক্টরের সংস্কার, আইনি ও নীতিগত নিশ্চয়তা, বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ, আয়কর ও অপরিবর্তনীয় নীতির উপর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ইজেড-গুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো। এসব করলে পুনরায় নতুন বিদেশি উদ্যোক্তা ও প্রকল্প দেশে আগ্রহী হবে এবং শিল্পায়নে গতি ফিরবে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























