চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডায়-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানা ‘ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড’ গত ২৮ জুন সকাল ৮টা থেকে কাঁচামাল সংকটের কারণে উৎপাদন স্থগিত করেছে। কারখানাটি প্রায় ২০ দিন ধরে বন্ধ থাকায় অভ্যন্তরীণ সার সরবরাহ চেইন ও কৃষি উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন।
কারখানার সাময়িক বন্ধের মূল কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে ফসফরিক অ্যাসিড সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন। চলমান মধ্যপ্রাচ্যীয় ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার ফলে শিপিং ও লজিস্টিকস খাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় জর্ডানসহ প্রধান উৎসগুলো থেকে সময়মতো অ্যাসিড আনা সম্ভব হয়নি। পরিণতি হিসেবে কারখানায় থাকা জরুরী মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বিসিআইসি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) ই-জিপির মাধ্যমে ২০ হাজার টন ফসফরিক অ্যাসিড আমদানের দরপত্র আহ্বান করে। আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ায় দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আর কে এন্টারপ্রাইজ কাজটি গ্রহণ করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী কাঁচামালটি জুন মাসের মধ্যেই সরবরাহ করার কথা ছিল।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য না পৌঁছায়। বিসিআইসি জরুরিভাবে ৮ ও ২৩ জুন দুটি নতুন দরপত্র আহ্বান করলেও বাজারের অস্থিরতার কারণে কেউ অংশ নেয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরবর্তীতে আরও দুটি দরপত্র আসবে, যা যথাক্রমে আগামী ৮ আগস্ট এবং ৯ সেপ্টেম্বরে খোলা হবে বলে জানানো হয়েছে।
কারখানার ক্ষমতা ও চাহিদার পরিসংখ্যান তুলে ধরে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দৈনিক ৫০০ টন ডিএপি সার উৎপাদন সক্ষমতার জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০০ টন ফসফরিক অ্যাসিড এবং ২০০ টনের বেশি অ্যামোনিয়া গ্যাস প্রয়োজন। কারখানার সর্বোচ্চ মজুৎ ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। কাঁচামাল সরবরাহ না থাকায় এই মজুতও শেষ হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ নিশ্চিত করতে হয়েছে।
ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈনুল হক বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন ঘটায় মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ আছে। তবে প্রশাসনিক ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে। সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি এখনো বলবৎ আছে; ফসফরিক অ্যাসিডের চালান পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত উৎপাদন পুনরায় শুরু করা হবে।’’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দেশে সারবিনা চাহিদা বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ৬৯ লাখ টন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিসিআইসি ইউরিয়া আমদানির কাজ করে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএডিসি নন-ইউরিয়া সার (টিএসপি, এমওপি, ডিএপি) আমদানি করে থাকে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা কারখানাগুলোতে মোট ৮৫৩,৭৯১ টন সার উৎপাদিত হয়েছিল।
সরবরাহ শৃঙ্খলে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তা দ্রুত সমাধান না হলে পরবর্তী শস্যজীবনের পুষ্টি পরিকল্পনা ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে কৃষি পরিবেশ ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল হতে এবং নতুন চালান পৌঁছাতে সময় লাগবে; সেই অপেক্ষায় উৎপাদন শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 






















