১০:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে অর্থনীতি নাজুক নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি জরুরি চ্যালেঞ্জ ড. ইউনূস লাল পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করবে না সরকার: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কারও চাঁদাবাজি করার সুযোগ নেই: সড়ক পরিবহণমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিঠি, অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি শিক্ষাকে রাজনীতির বাইরেই রাখবে সরকার: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ড. ইউনূসসহ বিদায়ী উপদেষ্টারা কূটনৈতিক পাসপোর্ট হস্তান্তর রমজানেই শুরু হবে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প

নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি জরুরি চ্যালেঞ্জ

রোজার প্রথমদিন থেকেই দেখায় দিল বাজার কতটা স্পর্শকাতর। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ছে, আর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও স্বস্তির কোনো খবর দিচ্ছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইএমএফের শর্ত মোকাবিলা, ঋণের বোঝা কমানো, কর সংগ্রহ বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার—এসবোই থেকে হচ্ছে নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে শুধু সঠিক নীতিই নয়, এগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দৃঢ়তা অপরিহার্য।

মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক অবস্থা উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশে উঠেছে; ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশ ছিল, যা জানুয়ারিতে ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্যপণ্যের দামে প্রতিটি বাড়তি ওঠাপড়া লক্ষ লক্ষ পরিবারকে সরাসরি আঘাত করে। ফলে নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষাগুলোই মূলত দাম-সংক্রান্ত হবে—দাম স্থিতিশীল করা না হলে জনআস্থা ক্ষুণ্ণ হবে এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, সরবরাহজট এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছে কঠোর বার্তা দিতে হবে। তিনি বলছেন, এ কাজে অর্থ, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তার সতর্কতা—নতুন সরকারের ‘‘হানিমুন পিরিয়ড’’ ছয় মাসের বেশি স্থায়ী নাও হতে পারে; ওই সময়সীমার পর মানুষের ধৈর্যের বাঁধ দ্রুত ছিন্ন হতে পারে।

অর্থনীতি ভঙ্গুর এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর ঝুঁকিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আইএমএফ প্রোগ্রামে ঢুকেছিল—তার পর থেকে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক উঠানামার মধ্যে গেছে। আগামী মাসে ঢাকায় আইএমএফ মিশন আসছে এবং সেখানে রাজনৈতিক কোনো অজুহাত মান্য হবে না। আইএমএফ মূলত রাজস্ব আদায়ে শৃঙ্খলা, মুদ্রানীতির সংকোচন এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের অগ্রগতির ওপর জোর দেবে। আইএমএফের সমর্থন কেবল অর্থ নয়, অন্যান্য দাতা সংস্থার আস্থা অর্জনের জন্যও প্রয়োজনীয়।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থমন্ত্রীকে প্রথমেই সম্পদের সঠিক হিসাব-নিকাশ দেখাতে হবে। আইএমএফ সংকোচনমূলক নীতি বা সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতে পারে—এভাবে মুদ্রানীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠবে। প্রশ্ন হলো: সরকার কি কঠোর বিনিয়োগ-হানুকুল নীতিই অবলম্বন করবে, নাকি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে শর্ত শিথিলের ওপরে কূচকানি করবে?

রিজার্ভের স্থিতিশীলতা হয়ত সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু তা ভঙ্গুর অর্থনীতির ফসল—বিনিয়োগ কমে গেছে, আমদানি কমেছে এবং ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নীচু। যদি সরকার প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে সফল হয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে রিজার্ভে নতুন চাপ আসবে। অতীতেও একসময় ৪৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ দ্রুত কমে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে, তাই সাবধানতা জরুরি।

সরকারি ঋণের বোঝাও দ্রুত বাড়ছে। মাত্র তিন বছরে মোট সরকারি ঋণ প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ঋণের উৎসে পরিবর্তন দেখা যায়—সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা কমছে আর ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে; ২০২২ সাল থেকে ব্যাংক খাতের ঋণ বৃদ্ধি প্রায় ৮৫ শতাংশ। ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে তারল্য সংগ্রহে সরকার প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর।

রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো হলে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হবে, কিন্তু তাৎক্ষণিক চাপও রয়েছে। বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে—এটি দেশের সারা বছরের স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় আড়াই গুণ সমান। মোস্তাফিজুরের পরামর্শ, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিলে লোকসান হবে। কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, ভ্যাট লিকেজ কমানো এবং সেবা-ভিত্তিক আধুনিক কয়রা আনা হলে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। এজন্য এনবিআর সংস্কার ও প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেওয়া জরুরি।

ব্যাংকিং খাতে গভীর সংস্কারের প্রয়োজন বহাল আছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন ও বোর্ডে পারিবারিক প্রতিনিধিত্ব কমানোসহ স্বচ্ছতা ও শাসনব্যবস্থা দৃঢ় করতে হবে, যাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আস্থা ফিরে আসে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়।

অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের বাইরেও ভূ-রাজনীতিক সময়সীমা আসে—নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ করছে। এটা অগ্রগতির প্রতীক হলেও বাণিজ্য সুবিধা কমলে রপ্তানিতে প্রভাব পড়তে পারে। নতুন সরকার ইতিমধ্যেই এলডিসি উত্তরণ অন্তত তিন বছর পেছানোর চেষ্টা করার ইঙ্গিত দিয়েছে; বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত বিএনপির নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সারকথা, নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি বড় এবং আন্তঃসংযুক্ত চাপ রয়েছে: মূল্যস্ফীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইএমএফ ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক, সরকারি ঋণের ব্যবহার ও আর্থিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব সংগ্রহ ও বাজেট ভারসাম্য, এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রয়োজন—আর সেটাই সফলতার একমাত্র রাস্তা। রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও পরিকল্পিত বাস্তবায়ন ছাড়া নতুন সরকারের ‘‘ভিতি’’ মজবুত করা সহজ হবে না, আর সাধারণ মানুষের অধৈর্যতা দ্রুত সরকারকে ফলস্বরূপ মূল্যায়ন করবে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে অর্থনীতি নাজুক

নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি জরুরি চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিতঃ ০৮:২৮:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রোজার প্রথমদিন থেকেই দেখায় দিল বাজার কতটা স্পর্শকাতর। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ছে, আর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও স্বস্তির কোনো খবর দিচ্ছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইএমএফের শর্ত মোকাবিলা, ঋণের বোঝা কমানো, কর সংগ্রহ বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার—এসবোই থেকে হচ্ছে নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে শুধু সঠিক নীতিই নয়, এগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দৃঢ়তা অপরিহার্য।

মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক অবস্থা উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশে উঠেছে; ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশ ছিল, যা জানুয়ারিতে ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্যপণ্যের দামে প্রতিটি বাড়তি ওঠাপড়া লক্ষ লক্ষ পরিবারকে সরাসরি আঘাত করে। ফলে নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষাগুলোই মূলত দাম-সংক্রান্ত হবে—দাম স্থিতিশীল করা না হলে জনআস্থা ক্ষুণ্ণ হবে এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, সরবরাহজট এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছে কঠোর বার্তা দিতে হবে। তিনি বলছেন, এ কাজে অর্থ, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তার সতর্কতা—নতুন সরকারের ‘‘হানিমুন পিরিয়ড’’ ছয় মাসের বেশি স্থায়ী নাও হতে পারে; ওই সময়সীমার পর মানুষের ধৈর্যের বাঁধ দ্রুত ছিন্ন হতে পারে।

অর্থনীতি ভঙ্গুর এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর ঝুঁকিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আইএমএফ প্রোগ্রামে ঢুকেছিল—তার পর থেকে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক উঠানামার মধ্যে গেছে। আগামী মাসে ঢাকায় আইএমএফ মিশন আসছে এবং সেখানে রাজনৈতিক কোনো অজুহাত মান্য হবে না। আইএমএফ মূলত রাজস্ব আদায়ে শৃঙ্খলা, মুদ্রানীতির সংকোচন এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের অগ্রগতির ওপর জোর দেবে। আইএমএফের সমর্থন কেবল অর্থ নয়, অন্যান্য দাতা সংস্থার আস্থা অর্জনের জন্যও প্রয়োজনীয়।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থমন্ত্রীকে প্রথমেই সম্পদের সঠিক হিসাব-নিকাশ দেখাতে হবে। আইএমএফ সংকোচনমূলক নীতি বা সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতে পারে—এভাবে মুদ্রানীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠবে। প্রশ্ন হলো: সরকার কি কঠোর বিনিয়োগ-হানুকুল নীতিই অবলম্বন করবে, নাকি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে শর্ত শিথিলের ওপরে কূচকানি করবে?

রিজার্ভের স্থিতিশীলতা হয়ত সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু তা ভঙ্গুর অর্থনীতির ফসল—বিনিয়োগ কমে গেছে, আমদানি কমেছে এবং ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নীচু। যদি সরকার প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে সফল হয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে রিজার্ভে নতুন চাপ আসবে। অতীতেও একসময় ৪৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ দ্রুত কমে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে, তাই সাবধানতা জরুরি।

সরকারি ঋণের বোঝাও দ্রুত বাড়ছে। মাত্র তিন বছরে মোট সরকারি ঋণ প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ঋণের উৎসে পরিবর্তন দেখা যায়—সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা কমছে আর ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে; ২০২২ সাল থেকে ব্যাংক খাতের ঋণ বৃদ্ধি প্রায় ৮৫ শতাংশ। ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে তারল্য সংগ্রহে সরকার প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর।

রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো হলে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হবে, কিন্তু তাৎক্ষণিক চাপও রয়েছে। বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে—এটি দেশের সারা বছরের স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় আড়াই গুণ সমান। মোস্তাফিজুরের পরামর্শ, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিলে লোকসান হবে। কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, ভ্যাট লিকেজ কমানো এবং সেবা-ভিত্তিক আধুনিক কয়রা আনা হলে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। এজন্য এনবিআর সংস্কার ও প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেওয়া জরুরি।

ব্যাংকিং খাতে গভীর সংস্কারের প্রয়োজন বহাল আছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন ও বোর্ডে পারিবারিক প্রতিনিধিত্ব কমানোসহ স্বচ্ছতা ও শাসনব্যবস্থা দৃঢ় করতে হবে, যাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আস্থা ফিরে আসে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়।

অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের বাইরেও ভূ-রাজনীতিক সময়সীমা আসে—নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ করছে। এটা অগ্রগতির প্রতীক হলেও বাণিজ্য সুবিধা কমলে রপ্তানিতে প্রভাব পড়তে পারে। নতুন সরকার ইতিমধ্যেই এলডিসি উত্তরণ অন্তত তিন বছর পেছানোর চেষ্টা করার ইঙ্গিত দিয়েছে; বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত বিএনপির নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সারকথা, নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি বড় এবং আন্তঃসংযুক্ত চাপ রয়েছে: মূল্যস্ফীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইএমএফ ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক, সরকারি ঋণের ব্যবহার ও আর্থিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব সংগ্রহ ও বাজেট ভারসাম্য, এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রয়োজন—আর সেটাই সফলতার একমাত্র রাস্তা। রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও পরিকল্পিত বাস্তবায়ন ছাড়া নতুন সরকারের ‘‘ভিতি’’ মজবুত করা সহজ হবে না, আর সাধারণ মানুষের অধৈর্যতা দ্রুত সরকারকে ফলস্বরূপ মূল্যায়ন করবে।