০৬:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
অনলাইন জুয়ার লেনদেনে দিনে ৫ কোটি: টঙ্গী–কুমিল্লায় অভিযানে ছয় গ্রেফতার বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী পরিবহন-লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী সৌদি আরব প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান: শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তুলুন পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী সৌদি আরব শিশুদের মানবিক গড়ে তোলায় শিক্ষকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান সৌদি আরব বাংলাদেশে পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: শিশুদের মানবিকভাবে গড়ুন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত নগর গড়তে কাজ করছে সরকার: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মানব পাচার ও প্রযুক্তি অপব্যবহার রোধে নতুন আইন কার্যকর হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

দীর্ঘদিন থেকেই শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তোফায়েল আহমেদ। গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুরুতর অবস্থায় তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ওই সময় থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এর আগে—একই দিন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়ায়, যা পরে চিকিৎসকরা নাকচ করে দেন। গত বছর ২০ নভেম্বর তার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদও মৃত্যুবরণ করেন।

জীবনে অসামান্য অবদান

তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহাপরিচালনার এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও প্রাণবন্ত চিত্র ছিলেন। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবার নাম মৌলভী আজহার আলী, মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। দাম্পত্য জীবনে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেলেন।

শিক্ষাজীবনে ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন।

রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি ছাত্রসেনার মধ্যেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন ১৯৬৬–৬৭ মেয়াদে। ১৯৬৮–৬৯ সালের গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলনে তিনি ডাকসু ভিপি ছিলেন এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজিত বিশাল জনসম্মেলনে তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ঘোষণা করেন—এটি ইতিহাসে স্মরণীয় এক মুহূর্ত।

রাষ্ট্র ও সংসদে ভূমিকা

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে প্রথমবার সংসদে নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার নেতার একজন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসাবে দায়িত্ব নেন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন—মোট ন’বার জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি ভোলা-১ আসন থেকে সাংসদ ছিলেন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন এবং দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও মন্ত্রিত্ব

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের সময় তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন। পরে ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিনি দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মন্ত্রী হিসাবে কাজ ও নীতি-নির্ধারণে দেশের শিল্প-বাণিজ্য জীবনে তাঁর প্রভাব সুস্পষ্ট ছিল।

সংকট ও নির্যাতন

রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সালের পর থেকে তিনি দীর্ঘ সময় জেলজীবন সহ নানা সময় গ্রেফতার ও কারাভোগ করেছেন। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিকের জীবনে বহু বেদনাদায়ক ও সংগ্রামী অধ্যায় ছিল, যা তাকে আরও রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় করেছে।

নিষ্ঠুরতায়ও স্মরণীয় এক জীবনের তালিকায় তোফায়েল আহমেদের নাম থাকবে—ছাত্র আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় নেতৃত্ব ও মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত তার অবদান অবারিত। পরিবার, দল ও দেশের পাশাপাশি অসংখ্য সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীর হৃদয়ও আজ শোকাহত।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

প্রকাশিতঃ ০২:২৭:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

দীর্ঘদিন থেকেই শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তোফায়েল আহমেদ। গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুরুতর অবস্থায় তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ওই সময় থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এর আগে—একই দিন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়ায়, যা পরে চিকিৎসকরা নাকচ করে দেন। গত বছর ২০ নভেম্বর তার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদও মৃত্যুবরণ করেন।

জীবনে অসামান্য অবদান

তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহাপরিচালনার এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও প্রাণবন্ত চিত্র ছিলেন। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবার নাম মৌলভী আজহার আলী, মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। দাম্পত্য জীবনে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেলেন।

শিক্ষাজীবনে ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন।

রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি ছাত্রসেনার মধ্যেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন ১৯৬৬–৬৭ মেয়াদে। ১৯৬৮–৬৯ সালের গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলনে তিনি ডাকসু ভিপি ছিলেন এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজিত বিশাল জনসম্মেলনে তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ঘোষণা করেন—এটি ইতিহাসে স্মরণীয় এক মুহূর্ত।

রাষ্ট্র ও সংসদে ভূমিকা

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে প্রথমবার সংসদে নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার নেতার একজন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসাবে দায়িত্ব নেন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন—মোট ন’বার জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি ভোলা-১ আসন থেকে সাংসদ ছিলেন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন এবং দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও মন্ত্রিত্ব

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের সময় তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন। পরে ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিনি দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মন্ত্রী হিসাবে কাজ ও নীতি-নির্ধারণে দেশের শিল্প-বাণিজ্য জীবনে তাঁর প্রভাব সুস্পষ্ট ছিল।

সংকট ও নির্যাতন

রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সালের পর থেকে তিনি দীর্ঘ সময় জেলজীবন সহ নানা সময় গ্রেফতার ও কারাভোগ করেছেন। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিকের জীবনে বহু বেদনাদায়ক ও সংগ্রামী অধ্যায় ছিল, যা তাকে আরও রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় করেছে।

নিষ্ঠুরতায়ও স্মরণীয় এক জীবনের তালিকায় তোফায়েল আহমেদের নাম থাকবে—ছাত্র আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় নেতৃত্ব ও মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত তার অবদান অবারিত। পরিবার, দল ও দেশের পাশাপাশি অসংখ্য সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীর হৃদয়ও আজ শোকাহত।