০৫:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ

দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে ইউরোপের তিন দেশে টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি শুরু

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে স্থাপিত স্পেন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘স্পেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ’ ৬ জুন থেকে টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি শুরু করেছে। উদ্বোধনী চালানে মোট ২০০ কনটেইনার প্রক্রিয়াজাত ভুট্টা পাঠানো হচ্ছে, যার মধ্যে স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালসহ ইউরোপের একাধিক বাজারে পণ্য সরবরাহ করা হবে। এই চালানের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ।

প্রকল্পটি দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী শেলটেক গ্রুপ ও স্পেনে ভিত্তি করা সেলেরিও গ্রুপ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করেছেন। কারখানাটির নির্মাণ কাজ প্রায় দেড় বছর আগে শুরু হয় এবং গত বছরের জুনে স্পেন থেকে আনা বিশেষ হাইব্রিড ভুট্টার বীজ দিয়ে চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের মধ্যে প্রথম চাষাবাদ শুরু হয়। এ পর্যন্ত এই উদ্যোগে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

এই প্রকল্পে বর্তমানে ৪ হাজার চুক্তিবদ্ধ কৃষক উচ্চ ফলনশীল ভুট্টা চাষ করছেন; প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের ১০০% ফসল ক্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং বীজ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করছে। সাধারণত দেশীয় পদ্ধতিতে গড়ে প্রতিটি ভুট্টার ছড়ার ওজন ২০০–২৫০ গ্রাম হলেও, স্পেনীয় হাইব্রিড বীজে এটি ৪০০–৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্কে আরও ৪০ হাজার কৃষক যুক্ত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।

শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ জানান, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে সুযোগ দেখে তারা এই খাতে বিনিয়োগ করেছে। সেলেরিও গ্রুপ প্রধানত প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বিপণনের দায়িত্ব সামলাবে। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে পার্বতীপুর কারখানায় প্রস্তুত সব প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী তাদের মাধ্যমেই রপ্তানি করা হবে, ফলে বাজারজাতকরণ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ নেই।

কারখানায় আনা ভুট্টা প্রথমে নির্দিষ্ট গুণগত মান যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় ক্যান বা কৌটজাত করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয় এবং কনটেইনারে ভরে রপ্তানির জন্য পাঠানো হয়।

ভুট্টার পাশাপাশি কারখানায় আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণও শুরু হয়েছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা আনারস টিনজাত করে রপ্তানির উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এখানে ফ্রুট ককটেল, শুকনা আনারস, শুকনা আমসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত ফলপণ্যও উৎপাদন করে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তানভীর আহমেদ জানান, কারখানাটির বার্ষিক রপ্তানি সক্ষমতা ১৫–১৭ কোটি ডলার, পূর্ণ ক্ষমতায় গেলে এটি ২০ কোটি ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করা হচ্ছে। তৎসময়ের তত্ত্বাবধানে তৎপরতা নেয়া হয়েছে যাতে তাজা আম ও লিচুও রপ্তানির সুযোগ কাজে লাগানো যায়।

শেলটেক গ্রুপ এ প্রকল্প ছাড়া আবাসন, টেক্সটাইল ও শিল্পখাতে বৃহৎ বিনিয়োগও করছে। রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় ৫৩ কাঠার ওপর ‘শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা’ নামে ১৭ তলা পরিবেশবান্ধব শপিংমল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে; প্রায় ২ লক্ষ বর্গফুট আয়তনের এই প্রকল্পে ৫৭৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ হওয়ার কথা এবং এখানে ৩৫০টি দোকান ও ফুডকোর্টসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে।

এছাড়া জেলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে যৌথ উদ্যোগে ২১টি আবাসিক প্রকল্পে ২৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ব্লেন্ডেড সুতার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এনভয় টেক্সটাইলস প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে এবং সিলেটে অ্যাব্রেসিভ পেপার উৎপাদনকারী গ্রাইন্ডটেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন কারখানায় কার্বন নিঃসরণ কমাতে ১০ মেগাওয়াট সৌরজ্বালানীর প্রকল্পও বাস্তবায়নাধীন।

বর্তমানে শেলটেক ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের অধীনে ৩১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রায় ১৭ হাজার কর্মী কাজ করছেন। কোম্পানির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মীসংখ্যা ৫৮ হাজার এবং বার্ষিক লেনদেন ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা।

সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ সম্পর্কে তানভীর আহমেদ বলেন, রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং আমদানির বিকল্প পণ্য দেশেই তৈরি করার উদ্দেশ্যই মূল চালিকা শক্তি। তিনি বলেন, ‘‘সমস্ত অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং ভ্যার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন বিবেচনায় রেখে এই বিনিয়োগগুলো করা হয়েছে, তাই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।’’

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

আসুন সবুজ ও নিরাপদ বসতি গড়ে তুলি: প্রধানমন্ত্রী

দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে ইউরোপের তিন দেশে টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি শুরু

প্রকাশিতঃ ০২:২৪:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে স্থাপিত স্পেন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘স্পেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ’ ৬ জুন থেকে টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি শুরু করেছে। উদ্বোধনী চালানে মোট ২০০ কনটেইনার প্রক্রিয়াজাত ভুট্টা পাঠানো হচ্ছে, যার মধ্যে স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালসহ ইউরোপের একাধিক বাজারে পণ্য সরবরাহ করা হবে। এই চালানের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ।

প্রকল্পটি দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী শেলটেক গ্রুপ ও স্পেনে ভিত্তি করা সেলেরিও গ্রুপ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করেছেন। কারখানাটির নির্মাণ কাজ প্রায় দেড় বছর আগে শুরু হয় এবং গত বছরের জুনে স্পেন থেকে আনা বিশেষ হাইব্রিড ভুট্টার বীজ দিয়ে চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের মধ্যে প্রথম চাষাবাদ শুরু হয়। এ পর্যন্ত এই উদ্যোগে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

এই প্রকল্পে বর্তমানে ৪ হাজার চুক্তিবদ্ধ কৃষক উচ্চ ফলনশীল ভুট্টা চাষ করছেন; প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের ১০০% ফসল ক্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং বীজ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করছে। সাধারণত দেশীয় পদ্ধতিতে গড়ে প্রতিটি ভুট্টার ছড়ার ওজন ২০০–২৫০ গ্রাম হলেও, স্পেনীয় হাইব্রিড বীজে এটি ৪০০–৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্কে আরও ৪০ হাজার কৃষক যুক্ত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।

শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ জানান, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে সুযোগ দেখে তারা এই খাতে বিনিয়োগ করেছে। সেলেরিও গ্রুপ প্রধানত প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বিপণনের দায়িত্ব সামলাবে। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে পার্বতীপুর কারখানায় প্রস্তুত সব প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী তাদের মাধ্যমেই রপ্তানি করা হবে, ফলে বাজারজাতকরণ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ নেই।

কারখানায় আনা ভুট্টা প্রথমে নির্দিষ্ট গুণগত মান যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় ক্যান বা কৌটজাত করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয় এবং কনটেইনারে ভরে রপ্তানির জন্য পাঠানো হয়।

ভুট্টার পাশাপাশি কারখানায় আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণও শুরু হয়েছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা আনারস টিনজাত করে রপ্তানির উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এখানে ফ্রুট ককটেল, শুকনা আনারস, শুকনা আমসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত ফলপণ্যও উৎপাদন করে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তানভীর আহমেদ জানান, কারখানাটির বার্ষিক রপ্তানি সক্ষমতা ১৫–১৭ কোটি ডলার, পূর্ণ ক্ষমতায় গেলে এটি ২০ কোটি ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করা হচ্ছে। তৎসময়ের তত্ত্বাবধানে তৎপরতা নেয়া হয়েছে যাতে তাজা আম ও লিচুও রপ্তানির সুযোগ কাজে লাগানো যায়।

শেলটেক গ্রুপ এ প্রকল্প ছাড়া আবাসন, টেক্সটাইল ও শিল্পখাতে বৃহৎ বিনিয়োগও করছে। রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় ৫৩ কাঠার ওপর ‘শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা’ নামে ১৭ তলা পরিবেশবান্ধব শপিংমল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে; প্রায় ২ লক্ষ বর্গফুট আয়তনের এই প্রকল্পে ৫৭৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ হওয়ার কথা এবং এখানে ৩৫০টি দোকান ও ফুডকোর্টসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে।

এছাড়া জেলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে যৌথ উদ্যোগে ২১টি আবাসিক প্রকল্পে ২৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ব্লেন্ডেড সুতার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এনভয় টেক্সটাইলস প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে এবং সিলেটে অ্যাব্রেসিভ পেপার উৎপাদনকারী গ্রাইন্ডটেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন কারখানায় কার্বন নিঃসরণ কমাতে ১০ মেগাওয়াট সৌরজ্বালানীর প্রকল্পও বাস্তবায়নাধীন।

বর্তমানে শেলটেক ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের অধীনে ৩১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রায় ১৭ হাজার কর্মী কাজ করছেন। কোম্পানির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মীসংখ্যা ৫৮ হাজার এবং বার্ষিক লেনদেন ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা।

সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ সম্পর্কে তানভীর আহমেদ বলেন, রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং আমদানির বিকল্প পণ্য দেশেই তৈরি করার উদ্দেশ্যই মূল চালিকা শক্তি। তিনি বলেন, ‘‘সমস্ত অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং ভ্যার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন বিবেচনায় রেখে এই বিনিয়োগগুলো করা হয়েছে, তাই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।’’