৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের শীর্ষ সম্মান স্বর্ণপাম জিতল রোমানিয়ান পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মুঙ্গিউর নতুন ছবি ‘ফিওড’—এই ঘোষণা করা হয়েছিল শনিবার রাতের সমাপনী অনুষ্ঠলে। প্রধান জুরি প্রধান পাক চান-উক পুরস্কারটি ঘোষণা করলে মুঙ্গিউ উৎসবেই দ্বিতীয়বারের মতো এই মহত্ত্বপূর্ণ সম্মান পেলেন; আগে ২০০৭ সালে তার ছবি ‘৪ মাস, ৩ সপ্তাহ ও ২ দিন’ তাদের জন্যই এই স্বীকৃতি পেয়েছিল।
পুরস্কার গ্রহণের সময় মুঙ্গিউ ‘ফিওড’কে সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও সহমর্মিতার গল্প হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন যে, এই মানবিক মূল্যবোধগুলো কেবল সিনেমার পাতায় নয়, বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা জরুরি।
‘ফিওড’ ছবিটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে নরওয়ের এক ছোট গ্রামে—একটি রোমানিয়ান পরিবার নতুন জীবন শুরু করতে এসে সেখানে সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ চাপের মুখে পড়ে। ধর্মীয়ভাবে محافظকূলের মধ্যে থাকা পরিবারের উপর হঠাৎ শিশুনির্যাতনের অভিযোগ ওঠে এবং কর্তৃপক্ষ তাদের সন্তানদের অপহরণ করে রাখে। নরওয়েজীয় সমাজের প্রগতিশীল ভাবমূর্তির আড়ালে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের প্রতিরোধ, ভয় ও দ্বন্দ্বকে সিনেমাটি সূক্ষ্মতায় তুলে ধরে। প্রদর্শনী হলে দর্শকরা ছবিটি দেখে তীব্র আবেগ ও ক্ষোভ অনুভব করেন; অনেক সমালোচক এটিকে উদারনৈতিক সমাজের ভণ্ডামি নিরীক্ষার সাহসী কাজ বলে অভিহিত করেছেন। প্রধানভূমিতে সেবাস্তিয়ান স্ট্যান ও রেনাতে রেইনসভে অভিনয় করেছেন, যারা তাদের পারফরম্যান্স দিয়ে ছবিকে শক্তি দিয়েছে।
উৎসবের দ্বিতীয় প্রধান সম্মান ‘গ্রাঁ প্রি’ জিতেছে রুশ পরিচালক আন্দ্রেই জভিয়াগিনতসেভের ‘মিনোটর’ ছবিটি। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবিটি একজন নির্মম ব্যবসায়ীর পারিবারিক সংকটকে কেন্দ্র করে গড়া; বর্তমানে ফ্রান্সে নির্বাসিত এই পরিচালক পুরস্কার গ্রহণের সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের রক্তপাত শেষ করার আহ্বান জানিয়ে দর্শকদের আবেগ আপ্লুত করেন।
এবার অভিনয় বিভাগে একাধিক পদকে যৌথ বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। রিউসুকে হামাগুচির ‘অল অব আ সাডেন’ ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রী হিসেবে সম্মান পেয়েছেন তাও ওকামোতো ও ভার্জিনি এফিরা। সেরা অভিনেতার পুরস্কারও যৌথভাবে গৃহীত হয়েছে লুকাস দন্তের ‘কাওয়ার্ড’ ছবির দুই অভিনেতা মাক্কিয়া ও ভ্যালোঁতাঁ কাম্পানির দ্বারা।
পরিচালনা ও অন্যান্য বিভাগেও বৈচিত্র্যের ছাপ দেখা গেছে। ভ্যালেস্কা গ্রিসবাখ ‘দ্য ড্রিমড অ্যাডভেঞ্চার’ ছবির জন্য জুরি পুরস্কার লাভ করেছেন। সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি পেয়েছেন পাওয়েল পাভলিকোভস্কি এবং একসঙ্গে স্প্যানিশ জুটি হাভিয়ের আমব্রোসি ও হাভিয়ের কালভো। ইরানের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ওপর নির্মিত পেগাহ আহাঙ্গারানির ‘রিহার্সালস ফর আ রেভোল্যুশন’ সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার অর্জন করেছে। প্রথাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি পুরস্কার ‘ক্যামেরা দ’অর’ — সেরা প্রথম চলচ্চিত্র—জিতেছে মেরি-ক্লেমেন্টিন দুসাবেজাম্বোর ‘বেন ইমানা’, যা রুয়ান্ডার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই সম্মান লাভ করে; পরিচালক এটিকে তাঁর দেশের নারীদের উৎসর্গ করেছেন।
এবারের কান উৎসব কেবল পুরস্কার প্রদানের জন্যই নয়; চলচ্চিত্র জগতের বড় কিছু বিতর্কও এখানে আলোচিত হয়েছে। মূল প্রতিযোগিতার ২২টি ছবির মধ্যে মাত্র পাঁচটি ছিল নারী নির্মাতাদের কাজ—এই অনুপাত নিয়ে স্টেজে জিনা ডেভিসসহ অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে হলিউডের বড় স্টুডিওগুলোর অনুপস্থিতি ও সিনেমায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে তীব্র আলোচনা কার্যত প্রতিটি প্রদর্শনী ও প্যানেলে চলেছে।
১২ মে থেকে শুরু হওয়া এই বিশ্ব চলচ্চিত্র মহোৎসবে জন ট্রাভোল্টা ও কেট ব্লাঞ্চেটের মতো তারকারাও উপস্থিত ছিলেন; তবু এবারের মূল আকর্ষণ ছিলেন দেশ-কাল-প্রীতিমুখী, জীবনমুখী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন স্বাধীন চলচ্চিত্রগুলো—যারা দর্শক ও সমালোচকদের আলোকপাত ও ভাবনা উস্কে দিয়েছে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 

























