১০:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৩ লাখ টাকা জরিমানা রামিসা হত্যা-ধর্ষণ মামলার বিচার শুরু হচ্ছে কাল হজ পরবর্তী ফিরতি অভিযানে দেশে ফিরেছেন ৬ হাজার ১৭৫ জন হাজি প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে দৃষ্টিহীন নূরজাহানের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হজ শেষ: দেশে ফিরেছেন ৬ হাজার ১৭৫ জন হাজি চালুর তিন মাসে নবনির্মিত এটিসি টাওয়ার আয় ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ টাকা জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকীতে দুস্থদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করলেন তারেক রহমান জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সমাধিতে তারেক রহমানের শ্রদ্ধা রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করলেন তারেক রহমান বর্জ্য অপসারণে গাফিলতির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

কোরবানির ঈদে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চার লাখ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা

কোরবানির ঈদ এখন শুধুই ধর্মীয় আচার নয়—এটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির একটি বড় মৌসুমি ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে। নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৬ সালে কোরবানির পশু ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সাড়ে তিন লাখ কোটি থেকে চার লাখ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি বলেছে, ‘‘কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মৌসুমি বাজারের অন্যতম।’’

এই বিশাল অর্থনৈতিক স্রোতের বড় অংশ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছে যায়। কয়েক লাখ ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষকের জন্য কোরবানির মরসুম বছরভর আয় নিশ্চিত করার এক প্রধান উৎস হয়ে থাকে। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান দেখায়, এ বছর দেশে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে, যেখানে অনুকূল চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। প্রতিটি পশুর গড় বিক্রয়মূল্য যদি ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ধরা হয়, তাহলে শুধুমাত্র পশু কেনাবেচাতেই এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।

পশুর বাজারের সাথে সঙ্গে জড়িত অন্যান্য খাতও গতিময় হচ্ছে—পশুখাদ্য, ভ্যাকসিন ও ওষুধ, খামার সরঞ্জামাদি থেকে শুরু করে পশু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত সবখানেই চাহিদা বেড়েছে। মাংস সংরক্ষণ ও ঠাণ্ডা ভাণ্ডারের প্রয়োজনীয়তার ফলে রেফ্রিজারেটর ও ডিপ ফ্রিজের বাজারে বড় ধরনের হটলাইন দেখা দিয়েছে; এমনকি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিরাও কিস্তি ও বিশেষ ছাড় দিয়ে ক্রেতাদের আর্কষণ করছে।

কোরবানির অর্থনীতির আরেকটি লক্ষ্যভিত্তিক ক্ষেত্র হলো পোশাক, কসমেটিকস ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যের বাজার। ব্যবসায়ীরা অনুমান করছেন, এই এক পুরোটাই ঈদেই ফ্যাশন ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্যে প্রায় ৮০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ কোটি টাকার পণ্য-বিক্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে পশু পরিবহন জড়িত ট্রাক-ভ্যান ও শ্রমিকদেরও এই সময় অতিরিক্ত আয় ঘটে—উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন জেলার হাজার হাজার যান নির্দিষ্ট সময়ে মহানগরীর পশুর হাটে যোগ দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূগোলিকভাবে দেশের মোট ঈদ বাণিজ্যের প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশই ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হয়; সেখানে আনুমানিক এক লাখ কোটি থেকে এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকার আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হতে পারে।

ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক শিল্পও এই সময়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কাঁচি-ছুরি, চাপাতি, বঁটি, চাটাই ও কামারশালাগুলো বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে থাকে—যে সব ব্যবসায়ীরা জাতীয় পরিসংখ্যে দেখা না গেলেও বাস্তবে হাজার হাজার নিম্ন আয়ের মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস তারা। ডিজিটাল খাতও এখন কোরবানির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে; অনলাইন পশুর হাট, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সহজেই সংযুক্ত করছে, ফলে লেনদেন আরও সংগঠিত হচ্ছে।

তবে সবটাই মাদক নয়—চামড়া শিল্পের চিত্র এখনও মলিন রয়ে গেছে। একসময় রপ্তানির বড় অংশ ছিল চামড়া থেকে, কিন্তু দুর্বল সংরক্ষণ, অনুপযোগী ট্যানারি ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মান না পাওয়ায় ওই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিকীকরণ ও সরবরাহশৃঙ্খলায় সংস্কার করলে চামড়া শিল্প ভবিষ্যতে বড় রপ্তানি উপার্জনের উৎস হিসেবে ফিরে আসতে পারে।

সামগ্রিকভাবে কোরবানির ঈদ গ্রামীণ আয় বাড়ানো, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সমর্থন, মৌসুমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প উৎপাদন চালিত করার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করে। তবে যাতে এই সুযোগ থেকে সবার জন্য সমানভাবে লাভ হয়, সেজন্য সুষ্ঠু সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় উন্নতি প্রয়োজন।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৩ লাখ টাকা জরিমানা

কোরবানির ঈদে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চার লাখ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা

প্রকাশিতঃ ০৭:২৪:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

কোরবানির ঈদ এখন শুধুই ধর্মীয় আচার নয়—এটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির একটি বড় মৌসুমি ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে। নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৬ সালে কোরবানির পশু ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সাড়ে তিন লাখ কোটি থেকে চার লাখ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি বলেছে, ‘‘কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মৌসুমি বাজারের অন্যতম।’’

এই বিশাল অর্থনৈতিক স্রোতের বড় অংশ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছে যায়। কয়েক লাখ ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষকের জন্য কোরবানির মরসুম বছরভর আয় নিশ্চিত করার এক প্রধান উৎস হয়ে থাকে। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান দেখায়, এ বছর দেশে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে, যেখানে অনুকূল চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। প্রতিটি পশুর গড় বিক্রয়মূল্য যদি ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ধরা হয়, তাহলে শুধুমাত্র পশু কেনাবেচাতেই এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।

পশুর বাজারের সাথে সঙ্গে জড়িত অন্যান্য খাতও গতিময় হচ্ছে—পশুখাদ্য, ভ্যাকসিন ও ওষুধ, খামার সরঞ্জামাদি থেকে শুরু করে পশু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত সবখানেই চাহিদা বেড়েছে। মাংস সংরক্ষণ ও ঠাণ্ডা ভাণ্ডারের প্রয়োজনীয়তার ফলে রেফ্রিজারেটর ও ডিপ ফ্রিজের বাজারে বড় ধরনের হটলাইন দেখা দিয়েছে; এমনকি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিরাও কিস্তি ও বিশেষ ছাড় দিয়ে ক্রেতাদের আর্কষণ করছে।

কোরবানির অর্থনীতির আরেকটি লক্ষ্যভিত্তিক ক্ষেত্র হলো পোশাক, কসমেটিকস ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যের বাজার। ব্যবসায়ীরা অনুমান করছেন, এই এক পুরোটাই ঈদেই ফ্যাশন ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্যে প্রায় ৮০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ কোটি টাকার পণ্য-বিক্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে পশু পরিবহন জড়িত ট্রাক-ভ্যান ও শ্রমিকদেরও এই সময় অতিরিক্ত আয় ঘটে—উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন জেলার হাজার হাজার যান নির্দিষ্ট সময়ে মহানগরীর পশুর হাটে যোগ দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূগোলিকভাবে দেশের মোট ঈদ বাণিজ্যের প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশই ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হয়; সেখানে আনুমানিক এক লাখ কোটি থেকে এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকার আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হতে পারে।

ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক শিল্পও এই সময়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কাঁচি-ছুরি, চাপাতি, বঁটি, চাটাই ও কামারশালাগুলো বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে থাকে—যে সব ব্যবসায়ীরা জাতীয় পরিসংখ্যে দেখা না গেলেও বাস্তবে হাজার হাজার নিম্ন আয়ের মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস তারা। ডিজিটাল খাতও এখন কোরবানির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে; অনলাইন পশুর হাট, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সহজেই সংযুক্ত করছে, ফলে লেনদেন আরও সংগঠিত হচ্ছে।

তবে সবটাই মাদক নয়—চামড়া শিল্পের চিত্র এখনও মলিন রয়ে গেছে। একসময় রপ্তানির বড় অংশ ছিল চামড়া থেকে, কিন্তু দুর্বল সংরক্ষণ, অনুপযোগী ট্যানারি ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মান না পাওয়ায় ওই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিকীকরণ ও সরবরাহশৃঙ্খলায় সংস্কার করলে চামড়া শিল্প ভবিষ্যতে বড় রপ্তানি উপার্জনের উৎস হিসেবে ফিরে আসতে পারে।

সামগ্রিকভাবে কোরবানির ঈদ গ্রামীণ আয় বাড়ানো, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সমর্থন, মৌসুমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প উৎপাদন চালিত করার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করে। তবে যাতে এই সুযোগ থেকে সবার জন্য সমানভাবে লাভ হয়, সেজন্য সুষ্ঠু সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় উন্নতি প্রয়োজন।