০৬:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ল — ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়তি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানের মিতসুই প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ জাতিসংঘে ছয় দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন ড. খলিলুর রহমান জাপানের মিতসুই প্রতিনিধিদলের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ ২৪ ঘণ্টায় হামে আরো ৬ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১,৩৩৪ প্রবাসী কার্ড চালু: বিএমইটি কার্ডের বিকল্পে একক ডিজিটাল সেবা মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল চীন সফরে আইএলও’র ১১৪তম সম্মেলনে সহ-সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর দশ গণমুখী উদ্যোগে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন

ওষুধ রপ্তানিতে ২৫ কোটি ডলারের মাইলফলক ছোঁয়ার পথে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প দ্রুত গতিতে আন্তর্জাতিক মান ধরে রেখে রপ্তানি বাড়াচ্ছে। কেবল ঘরোয়া চাহিদা পূরণ নয়, বিশ্ববাজারেও এখন দেশের ওষুধের চাহিদা 눈ে পড়ার মতো বেড়েছে। ফলশ্রুতিতে এই খাত এবার প্রথমবারের মতো ২৫ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করার শক্ত সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই–এপ্রিল) ওষুধ রপ্তানি থেকে পাওয়া আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯.৭০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে এককভাবে রপ্তানি আয় ১০০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রবৃদ্ধির ত্বরান্বিত ইঙ্গিত দিয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই মাসে ২৫ কোটি ডলারের ঘর ছোঁয়ার আশা তীব্র হচ্ছে।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ২০১০–১১ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি ছিল মাত্র ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার, সেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে — প্রায় পাঁচগুণেরও বেশি বৃদ্ধি। এই সময়কালে মাত্র একবার সামান্য পতন দেখা গেলেও নিয়মিতভাবে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় ছিল। ২০২৩–২৪ অর্থবছরেই প্রথমবারের মতো রপ্তানি আয় ২০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে একটি নতুন মাইলফলক অর্জিত হয়েছিল।

বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশে দেশীয় ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। গত দুই বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ওষুধপণ্য বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে। অল্প সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও উন্নত দেশগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন ধারণ করায় অন্তত ১০টি স্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে পুরোভাগে প্রবেশ করেছে।

রপ্তানির বড় অংশ আসছে কয়েকটি প্রধান কোম্পানির হাত ধরে — বেক্সিমকো ফার্মা, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস মিলিয়ে দেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক আয় জোগাচ্ছে। এছাড়া রেনাটা, একমি, অ্যারিস্টোফার্মা, এসকেএফ ও বিকন ফার্মা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানরাও তালিকায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

তবে উন্নত মনোবল ও সফল রপ্তানির মধ্যেও শিল্পটিকে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। দেশে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৯৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও মূল কাঁচামাল — অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) —-এর বড় অংশই চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। এর ফলে বছরে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ১৭ বছর আগে গড়ে তোলা এপিআই শিল্পপার্ক এখনও পূর্ণ ক্ষমতায় কার্যকর হয়নি; অধিকাংশ প্লট আজও অব্যবহৃত থাকায় স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের লক্ষ্য পিছিয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদন বাড়ানো যায় এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ওষুধ রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বর্তমানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৪০টির বেশি এপিআই উৎপাদন করছে; সংগঠিত সমর্থন পেলে মোট চাহিদার প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ দেশেই উৎপাদন করা যেতে পারে।

কী করা দরকার? বিশেষজ্ঞরা শ্রমিক দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ও ইনসেনটিভ কাঠামো সহজ করা, আরোপিত নিয়মকানুনে স্বচ্ছতা আনা এবং নমুনা পরীক্ষা ও অনুমোদনের সময়সীমা সংক্ষেপ করার পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে শিল্পপার্কগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো ও সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার করাও জরুরি। একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করলে দ্রুত নকশা ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে অভিমত রয়েছে প্রাসঙ্গিকদের।

সংক্ষেপে, বাংলাদেশি ওষুধশিল্প এখন দ্রুত পেছনের থেকে সামনে উঠে আসছে এবং ছোটখাটো বাধা কাটিয়ে যদি কাঁচামাল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো যায়, তাহলে এই শিল্প দেশের জন্য পরবর্তী দশকে আরও বড় রপ্তানি প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রা আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ল — ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়তি

ওষুধ রপ্তানিতে ২৫ কোটি ডলারের মাইলফলক ছোঁয়ার পথে বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ ০২:২৩:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প দ্রুত গতিতে আন্তর্জাতিক মান ধরে রেখে রপ্তানি বাড়াচ্ছে। কেবল ঘরোয়া চাহিদা পূরণ নয়, বিশ্ববাজারেও এখন দেশের ওষুধের চাহিদা 눈ে পড়ার মতো বেড়েছে। ফলশ্রুতিতে এই খাত এবার প্রথমবারের মতো ২৫ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করার শক্ত সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই–এপ্রিল) ওষুধ রপ্তানি থেকে পাওয়া আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯.৭০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে এককভাবে রপ্তানি আয় ১০০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রবৃদ্ধির ত্বরান্বিত ইঙ্গিত দিয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই মাসে ২৫ কোটি ডলারের ঘর ছোঁয়ার আশা তীব্র হচ্ছে।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ২০১০–১১ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি ছিল মাত্র ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার, সেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে — প্রায় পাঁচগুণেরও বেশি বৃদ্ধি। এই সময়কালে মাত্র একবার সামান্য পতন দেখা গেলেও নিয়মিতভাবে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় ছিল। ২০২৩–২৪ অর্থবছরেই প্রথমবারের মতো রপ্তানি আয় ২০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে একটি নতুন মাইলফলক অর্জিত হয়েছিল।

বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশে দেশীয় ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। গত দুই বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ওষুধপণ্য বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে। অল্প সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও উন্নত দেশগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন ধারণ করায় অন্তত ১০টি স্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে পুরোভাগে প্রবেশ করেছে।

রপ্তানির বড় অংশ আসছে কয়েকটি প্রধান কোম্পানির হাত ধরে — বেক্সিমকো ফার্মা, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস মিলিয়ে দেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক আয় জোগাচ্ছে। এছাড়া রেনাটা, একমি, অ্যারিস্টোফার্মা, এসকেএফ ও বিকন ফার্মা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানরাও তালিকায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

তবে উন্নত মনোবল ও সফল রপ্তানির মধ্যেও শিল্পটিকে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। দেশে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৯৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও মূল কাঁচামাল — অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) —-এর বড় অংশই চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। এর ফলে বছরে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ১৭ বছর আগে গড়ে তোলা এপিআই শিল্পপার্ক এখনও পূর্ণ ক্ষমতায় কার্যকর হয়নি; অধিকাংশ প্লট আজও অব্যবহৃত থাকায় স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের লক্ষ্য পিছিয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদন বাড়ানো যায় এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ওষুধ রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বর্তমানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৪০টির বেশি এপিআই উৎপাদন করছে; সংগঠিত সমর্থন পেলে মোট চাহিদার প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ দেশেই উৎপাদন করা যেতে পারে।

কী করা দরকার? বিশেষজ্ঞরা শ্রমিক দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ও ইনসেনটিভ কাঠামো সহজ করা, আরোপিত নিয়মকানুনে স্বচ্ছতা আনা এবং নমুনা পরীক্ষা ও অনুমোদনের সময়সীমা সংক্ষেপ করার পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে শিল্পপার্কগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো ও সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার করাও জরুরি। একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করলে দ্রুত নকশা ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে অভিমত রয়েছে প্রাসঙ্গিকদের।

সংক্ষেপে, বাংলাদেশি ওষুধশিল্প এখন দ্রুত পেছনের থেকে সামনে উঠে আসছে এবং ছোটখাটো বাধা কাটিয়ে যদি কাঁচামাল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো যায়, তাহলে এই শিল্প দেশের জন্য পরবর্তী দশকে আরও বড় রপ্তানি প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রা আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।