দীর্ঘ অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকটের প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সরকার বলছে, ‘‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’’ দর্শন এবং ‘‘সবার আগে বাংলাদেশ’’ নীতি মাথায় রেখে বাজেটটি সাজানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো।
নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলা, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের নানা পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ কমানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের খরচে স্বস্তি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজেটে খাদ্যদাবি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের উৎসে কর ব্যাপকভাবে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে; এটি আগে বিদ্যমান ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশের পরিবর্তে করা হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬০ ধরনের খাদ্য ও কৃষিপণ্য—ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন, তেল, চিনি ও অন্যান্য—এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে। সরকার বলছে, বাজারে সরবরাহ সচল রাখা ও ভোক্তার স্তরে মূল্যচাপ কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব ও ঘাটতি: বাজেট খরচ সামলাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা; তার মধ্যে এনবিআরের অংশীদারি লক্ষ্য প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব সংগ্রহের পরও বাজেটে ঘাটতি থাকবে প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে; বাকি অর্থ বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে।
মানবসম্পদ ও সামাজিক সুরক্ষা: এ বাজেটে অবকাঠামোর তুলনায় মানবসম্পদে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে নতুনভাবে ডিজাইন করতে কার্ডভিত্তিক কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড সম্প্রসারণ ও প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাজেটে বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা: তরুণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি উৎসাহিত করতে ফ্রিল্যান্সার ও স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব রয়েছে। বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য ৩০০ কোটি টাকা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল রাখা হচ্ছে।
কর ও মাইক্রোনীতি: সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমাতে করমুক্ত আয়সীমা ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকছে। জ্বালানি, ভোজ্যতেলসহ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর ও শুল্ক-কর হ্রাসের প্রস্তাব রাখা হতে পারে; কিন্তু ধনী ও উচ্চ আয়ের শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত কর বা সারচার্জ বাড়ার সম্ভাবনাও উল্লিখিত হয়েছে। সরকারি সেবায় ডিজিটাল সহজীকরণে ‘বাংলাবিজ’ নামে একক ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনাও বাজেটে স্থাপিত রয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অপেক্ষিত নতুন পে-স্কেল (নবম পে-স্কেল) আংশিক বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে।
চ্যালেঞ্জ: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিচ্ছেন। চলতি বছরের মে মাসে কনজিউমার প্রাইজ ইন্ডেক্স অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে; সরকারের টার্গেট আগামী বছর ৭.৫ শতাংশে নামানো। বিশাল বাজেট বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই কঠোর বাজার মনিটরিং ও সঠিক মুদ্রানীতি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বিশেষ বেড়ে তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ বলছে, নির্বাচনী ইশতেহারকে প্রতিফলিত করে কল্যাণমুখী এই বাজেট দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলার চেষ্টা করবে। সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হলে আপাতত অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানোর আশা প্রকাশ করেছে সরকার।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























