সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন গাড়ি ক্রয়, সরকারি অর্থায়নে বিদেশভ্রমণ ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণসহ কয়েকটি খাতে ব্যয় বন্ধ বা সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্তে নতুন ভবন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আনা হয়েছে। সরকার বলেছে, সীমিত সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
বুধবার (৮ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। পরিপত্রটি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, সরকারিভিত্তিক করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, যদিও সাশ্রয়ী ব্যয়ের নীতি আগে থেকেই অনুসরণ করা হচ্ছিল, পরিচালন বাজেটের আওতায় ব্যয় অনেক কমানোর সুযোগ সীমিত। তবু সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কৃচ্ছ্রসাধন নীতি শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা হলো।
পরিপত্রের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, পরিচালন বাজেটের আওতায় সব ধরনের থোক বরাদ্দ (অর্থনৈতিক কোড ৩৯১১১১১ ও ৪৯১১১১১) থেকে ব্যয় বন্ধ থাকবে। মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থও খরচ করা যাবে না। তবে দু ধরনের ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে — ১০ বছরের বেশি পুরোনো টিওএন্ডইভুক্ত (TO&E) যানবাহন প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এবং নবগঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের টিওএন্ডইভুক্ত যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে ক্রয় করা যাবে।
অন্যদিকে অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত মোটরযানকে ব্যতিক্রম হিসেবে রাখা হয়েছে। তাছাড়া নতুন বা প্রতিস্থাপনযোগ্য জিপ ও কার হলে সেগুলো অবশ্যই সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিকচালিত হতে হবে (অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি ব্যতীত)।
পরিচালন বাজেটের আওতায় নতুন আবাসিক, অনাবাসিক ও অন্যান্য ভবন নির্মাণও স্থগিত করা হয়েছে। চলমান নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে যদি কাজের অন্তত ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিলে তা চালিয়ে নেওয়া হবে। ভূমি অধিগ্রহণ খাতের বরাদ্দও সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম বা ঋণ প্রদানে স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছে।
উন্নয়ন বাজেটেও মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা বন্ধ থাকবে; তবে পরিপত্র জারির আগে অনুমোদিত প্রকল্পসমূহে এই শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। উন্নয়ন বাজেটের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নিলে খরচ করা যাবে। পরিকল্পনা কমিশনের ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’র সংরক্ষিত বরাদ্দও অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যয় করা যাবে।
বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও বহু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে সমস্ত বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ আপাতত বন্ধ থাকবে। কেবলমাত্র উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি সরকারের দেওয়া বৃত্তি/ফেলোশিপে স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট পর্যায়ের পড়াশোনার জন্য বিদেশ ভ্রমণ অনুমোদিত থাকবে। বিদেশি সরকার, প্রতিষ্ঠান বা উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে আয়োজিত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণগুলোকেও নির্দিষ্ট শর্তে অনুমোদন দেওয়া হবে এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোর মৌলিক ও আবশ্যিক বিদেশ অংশ উপযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করার সুযোগ থাকবে।
পণ্য জাহাজীকরণের পূর্বপর্যায় পরিদর্শন এবং কারখানায় গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষার জন্য কেবল জটিল প্রকৃতির পণ্য বা যেখানে এ ধরনের পরিদর্শন বাধ্যতামূলক সেই দাবি থাকলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা কারিগরিভাবে সনদপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ বিবেচনা করা হবে। তবে এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা করানোর বিকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
পরিপত্রের শেষভাগে বলা হয়েছে, পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট—উভয়ক্ষেত্রেই প্রতিটি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের এই কৃচ্ছ্রসাধন নীতির লক্ষ্য সাময়িক হলেও ব্যয়ের ধারায় স্বচ্ছতা ও জোরালো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























