০৮:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
তথ্যমন্ত্রী: তারেক রহমান সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নেতা প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান অতিথির উপস্থিতিতে ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ: বন্ধ ও রুগ্ন শিল্প কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি পুনর্গঠন ঈদের আগেই চালু হবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প ঈদের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ একনেকসহ তিনটি মন্ত্রিসভা-সংক্রান্ত কমিটি পুনর্গঠন সরওয়ার আলম আবার রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব হিসেবে নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এক ঘণ্টায় খিলগাঁও থেকে অপহৃত স্কুলছাত্র উদ্ধার ঈদুল ফিতরের ট্রেনযাত্রা: ৩ মার্চ থেকে শুরু অগ্রিম টিকিট বিক্রি

মৌলভীবাজারের খাড়িয়া ভাষার শেষ বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম দুই বোনের হাতে

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বর্মাছড়া চা-বাগানের নিরিবিলি পরিবেশে বসবাস করেন ৮১ বছর বয়সী ভেরোনিকা কেরকেটা ও তার ৭৬ বছর বয়সী বোন খ্রিস্টিনা কেরকেটা। একে দেখলে তারা সাধারণ বৃদ্ধা মনে হতে পারে, তবে তাদের কাছে গোপন রয়েছে বাংলাদেশের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। তারা দুজনই বাংলাদেশে খাড়িয়া ভাষার শেষ রক্ষক ও ধারক। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, তাদের মৃত্যুতে এই বিপন্ন ভাষা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

এক সময় চা বাগানাঞ্চলে অসংখ্য খাড়িয়া মানুষ এই ভাষায় কথা বলত, তবে বর্তমানে তা কেবল স্মৃতিতে রয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের খাড়িয়ারা মূলত সাদ্রি-বাংলা বা দেশোয়ালি ভাষার মিশ্রণ ব্যবহার করে, তবে প্রকৃত খাড়িয়া ভাষা বলতে আত্মীয়দের কাছেই শোনা যায় ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনা। ভেরোনিকা দুঃখের সাথে বলেন, ‘‘পাঁচ বছর আগে আমরা কয়েকজন বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতাম, এখন শুধু আমি আর আমার বোন আছি। আমাদের চলে গেলে এই ভাষা চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে।’’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৯৮.২৭ শতাংশ মানুষ বাংলায় ভাষায় কথা বলে, তবে চা-বাগান এলাকার ২৯টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তবে বৈজ্ঞানিক ভাষা গবেষণায় খাড়িয়া, বম, কোল, খাসি, মুন্ডারি ও রেংমিতচর ভাষাগুলিকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের ৪১টি শ্রমিক কলোনিতে প্রায় এক হাজার খাড়িয়া মানুষ বাস করে, তবে মূল ভাষাটি হারিয়ে যেতে বসেছে চর্চার অভাবের কারণে।

২০১৭ সালে ‘বীর তেলেঙ্গা খাড়িয়া ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার’ ও ‘উত্তরণ যুব সংঘ’ উদ্যোগে ভাষাটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শুরু হয়। ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনা শিশুদের এই ভাষা শেখানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আর্থিক ও কাঠামোগত নানা সংকটে সেই উদ্যোগ এখনো পূর্ণতা পায়নি। উদ্যোক্তা পিওস নানোয়া জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই আদিম ভাষা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ না এলে এই ভাষা কেবল নথিপত্রে রয়ে যাবে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় প্রশাসন আন্তরিক। আমরা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এই প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জানিয়েছি।’’

একটি জাতির মূল পরিচয় তার ভাষায় লুকিয়ে থাকে। ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভাষার অস্তিত্বও হারিয়ে যেতে পারে, এটাই এখন সময়ের অপেক্ষা। ভাষার গবেষকদের মতে, এখনই শব্দকোষ প্রস্তুত বা রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে এই ভাষা সংরক্ষণের শেষ সুযোগ।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

ভারত সফরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

মৌলভীবাজারের খাড়িয়া ভাষার শেষ বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম দুই বোনের হাতে

প্রকাশিতঃ ০৬:০০:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বর্মাছড়া চা-বাগানের নিরিবিলি পরিবেশে বসবাস করেন ৮১ বছর বয়সী ভেরোনিকা কেরকেটা ও তার ৭৬ বছর বয়সী বোন খ্রিস্টিনা কেরকেটা। একে দেখলে তারা সাধারণ বৃদ্ধা মনে হতে পারে, তবে তাদের কাছে গোপন রয়েছে বাংলাদেশের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। তারা দুজনই বাংলাদেশে খাড়িয়া ভাষার শেষ রক্ষক ও ধারক। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, তাদের মৃত্যুতে এই বিপন্ন ভাষা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

এক সময় চা বাগানাঞ্চলে অসংখ্য খাড়িয়া মানুষ এই ভাষায় কথা বলত, তবে বর্তমানে তা কেবল স্মৃতিতে রয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের খাড়িয়ারা মূলত সাদ্রি-বাংলা বা দেশোয়ালি ভাষার মিশ্রণ ব্যবহার করে, তবে প্রকৃত খাড়িয়া ভাষা বলতে আত্মীয়দের কাছেই শোনা যায় ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনা। ভেরোনিকা দুঃখের সাথে বলেন, ‘‘পাঁচ বছর আগে আমরা কয়েকজন বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতাম, এখন শুধু আমি আর আমার বোন আছি। আমাদের চলে গেলে এই ভাষা চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে।’’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৯৮.২৭ শতাংশ মানুষ বাংলায় ভাষায় কথা বলে, তবে চা-বাগান এলাকার ২৯টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তবে বৈজ্ঞানিক ভাষা গবেষণায় খাড়িয়া, বম, কোল, খাসি, মুন্ডারি ও রেংমিতচর ভাষাগুলিকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের ৪১টি শ্রমিক কলোনিতে প্রায় এক হাজার খাড়িয়া মানুষ বাস করে, তবে মূল ভাষাটি হারিয়ে যেতে বসেছে চর্চার অভাবের কারণে।

২০১৭ সালে ‘বীর তেলেঙ্গা খাড়িয়া ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার’ ও ‘উত্তরণ যুব সংঘ’ উদ্যোগে ভাষাটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শুরু হয়। ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনা শিশুদের এই ভাষা শেখানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আর্থিক ও কাঠামোগত নানা সংকটে সেই উদ্যোগ এখনো পূর্ণতা পায়নি। উদ্যোক্তা পিওস নানোয়া জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই আদিম ভাষা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ না এলে এই ভাষা কেবল নথিপত্রে রয়ে যাবে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় প্রশাসন আন্তরিক। আমরা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এই প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জানিয়েছি।’’

একটি জাতির মূল পরিচয় তার ভাষায় লুকিয়ে থাকে। ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভাষার অস্তিত্বও হারিয়ে যেতে পারে, এটাই এখন সময়ের অপেক্ষা। ভাষার গবেষকদের মতে, এখনই শব্দকোষ প্রস্তুত বা রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে এই ভাষা সংরক্ষণের শেষ সুযোগ।