১১:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী হামে আরও চার শিশুর মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১১৫ থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র–সরঞ্জাম ব্যবহার করে ডাকাতি: র‍্যাব দুই গ্রেপ্তার মিরপুরের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে রহস্যময় আগুন; ৮৩টি ল্যাপটপ অনুপস্থিত ৩ মে থেকে চার দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন দিগন্তে প্রথম ধাক্কা: সিলেটে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করলেন ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ ঢাকা-সহ দেশের সব থানাকে দালালমুক্ত করার নির্দেশ দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিএমপি: শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে মে দিবস: নয়াপল্টনে শ্রমিক দলের সমাবেশে তারেক রহমান ষড়যন্ত্রকারীদের মোক্ষম জবাব দেওয়ার আহ্বান

হাওরে বোরো ধানের মহাবিপর্যয়: ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি, ১ লাখ ১২ হাজার কৃষক অনিশ্চয়তায়

উজানের ঢল ও অনবরত বর্ষণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের আমদানি বৃষ্টিপাত এবং সীমান্ত নদী থেকে নেমে আসা পাহাড়ি পানির তোড়ে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর আধ-পাকা ও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই দুই জেলায় ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ অনুমান করা হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মতো। উপকূল নয়, এ ধাক্কা পড়েছে হাওরের কৃষকদের কাঁধেই — এক লক্ষ বারো হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এখন অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে বিভিন্ন হাওরে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নিমজ্জিত; এর বাজারমূল্য প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। সুনামগঞ্জে প্রায় ৮০ হাজারের বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলছেন—ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে অনিয়ম, দুর্বল কাঁচামাল ও তদারকির ঘাটতি থাকার কারণে বাঁধগুলো পাহাড়ি ঢলের চাপ সামলাতে পারেনি।

কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলও তেমনই কঠিন পরিস্থিতির মুখে। ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে। সেখানে প্রভাবিত কৃষকের সংখ্যা আনোপেক্ষায় ৩২ হাজারের বেশি এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়। কৃষকরা বলছেন, আপদে ধান কাটা জরুরি হলেও বারবার বজ্রবিদ্যুৎ, কালবৈশাখী ও ঝড়ের কারণে বেশি সময় মাঠে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে; ফলে গুনে ফেলার আগেই ফসল পচে যাচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ও দুর্বল বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো, শ্রমিক সংকট এবং যান্ত্রিকতার অভাব। অনেক স্থানে শ্রমিকরা কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাটা শুরু করলেও হারভেস্টার চালানোর মতো পরিস্থিতি নেই; ফলে কাটার গতি বাড়ে না এবং পানির মধ্যে থাকা ধান দ্রুত নষ্ট হয়। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ঋণ নিয়ে ধান রোপণ করেছিলেন; এখন ফসল নষ্ট হলে তাঁদের সংসারের রক্ষা কীভাবে হবে, কেউ বলতে পারছেন না। অনেকেই বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ধনু ও মেঘনা নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার নিচে থাকলেও উজানে চেরাপুঞ্জি এলাকায় অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড়ি ঢলের প্রবাহ স্থির না হওয়ায় নীচের অংশগুলো দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ আবহাওয়া পূর্বাভাসে আগামী এক সপ্তাহে পরিস্থিতি তৎক্ষণাত উল্লেখযোগ্যভাবে কিছুটা উন্নতি হওয়ার লক্ষণ এখনও মেলেনি; ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় বিশেষ ত্রাণ ও প্রণোদনা কার্যক্রম শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে, তবে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কতটুকু সহায়তা দ্রুত পৌঁছাবে—সে ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে স্থানীয়দের দ্রুত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হলে কার্যকরতর ও নিয়োজিত উদ্যোগের প্রয়োজন বলে কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।

হাওরজুড়ে এখন কেবল পচে যাচ্ছে সোনালি ফসলই নয়—গৃহস্থালি অনিশ্চয়তা, ঋণের বোঝা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অন্ধকারও দলের মতো ঘন হয়ে উঠছে। কৃষকরা আপদে দ্রুত কার্যকর ত্রাণ, মাঠ পর্যায়ের মেরামত এবং শীঘ্রই পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করছেন। সময়োপযোগী পরিকল্পনা না হলে এই মৌসুমের ক্ষতি অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী দুর্দশায় রূপ নিতে পারে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

হাওরে বোরো ধানের মহাবিপর্যয়: ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি, ১ লাখ ১২ হাজার কৃষক অনিশ্চয়তায়

প্রকাশিতঃ ১০:৩৮:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬

উজানের ঢল ও অনবরত বর্ষণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের আমদানি বৃষ্টিপাত এবং সীমান্ত নদী থেকে নেমে আসা পাহাড়ি পানির তোড়ে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর আধ-পাকা ও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই দুই জেলায় ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ অনুমান করা হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মতো। উপকূল নয়, এ ধাক্কা পড়েছে হাওরের কৃষকদের কাঁধেই — এক লক্ষ বারো হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এখন অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে বিভিন্ন হাওরে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নিমজ্জিত; এর বাজারমূল্য প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। সুনামগঞ্জে প্রায় ৮০ হাজারের বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলছেন—ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে অনিয়ম, দুর্বল কাঁচামাল ও তদারকির ঘাটতি থাকার কারণে বাঁধগুলো পাহাড়ি ঢলের চাপ সামলাতে পারেনি।

কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলও তেমনই কঠিন পরিস্থিতির মুখে। ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে। সেখানে প্রভাবিত কৃষকের সংখ্যা আনোপেক্ষায় ৩২ হাজারের বেশি এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়। কৃষকরা বলছেন, আপদে ধান কাটা জরুরি হলেও বারবার বজ্রবিদ্যুৎ, কালবৈশাখী ও ঝড়ের কারণে বেশি সময় মাঠে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে; ফলে গুনে ফেলার আগেই ফসল পচে যাচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ও দুর্বল বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো, শ্রমিক সংকট এবং যান্ত্রিকতার অভাব। অনেক স্থানে শ্রমিকরা কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাটা শুরু করলেও হারভেস্টার চালানোর মতো পরিস্থিতি নেই; ফলে কাটার গতি বাড়ে না এবং পানির মধ্যে থাকা ধান দ্রুত নষ্ট হয়। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ঋণ নিয়ে ধান রোপণ করেছিলেন; এখন ফসল নষ্ট হলে তাঁদের সংসারের রক্ষা কীভাবে হবে, কেউ বলতে পারছেন না। অনেকেই বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ধনু ও মেঘনা নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার নিচে থাকলেও উজানে চেরাপুঞ্জি এলাকায় অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড়ি ঢলের প্রবাহ স্থির না হওয়ায় নীচের অংশগুলো দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ আবহাওয়া পূর্বাভাসে আগামী এক সপ্তাহে পরিস্থিতি তৎক্ষণাত উল্লেখযোগ্যভাবে কিছুটা উন্নতি হওয়ার লক্ষণ এখনও মেলেনি; ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় বিশেষ ত্রাণ ও প্রণোদনা কার্যক্রম শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে, তবে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কতটুকু সহায়তা দ্রুত পৌঁছাবে—সে ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে স্থানীয়দের দ্রুত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হলে কার্যকরতর ও নিয়োজিত উদ্যোগের প্রয়োজন বলে কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।

হাওরজুড়ে এখন কেবল পচে যাচ্ছে সোনালি ফসলই নয়—গৃহস্থালি অনিশ্চয়তা, ঋণের বোঝা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অন্ধকারও দলের মতো ঘন হয়ে উঠছে। কৃষকরা আপদে দ্রুত কার্যকর ত্রাণ, মাঠ পর্যায়ের মেরামত এবং শীঘ্রই পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করছেন। সময়োপযোগী পরিকল্পনা না হলে এই মৌসুমের ক্ষতি অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী দুর্দশায় রূপ নিতে পারে।