দেশে তীব্র বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে সাত জেলায় প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ জনে; পাশাপাশি ৪৩ জেলায় ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বলা হয়েছে, বিকাল ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৫৬ জন মারা গেছেন। রাঙামাটি জেলায় ৩ জন, বান্দরবান ৬ জন, কক্সবাজারে ৩১ জন, চট্টগ্রামে ১৫ জন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজারে নিহতদের মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় ও ১৩ জন রোহিঙ্গা বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ৫৯টি উপজেলা, ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যা-জলাবদ্ধতায় প্লাবিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সার্বিকভাবে ১,০৫৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে এখন পর্যন্ত ১০,৮৫৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন। মন্ত্রণালয় অনুসারে বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে।
মানবিক সহায়তার হিসেবে সরকার এখন পর্যন্ত সারাদেশে মোট ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা ও ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে বন্যাকবলিত সাত জেলায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল। বাকি ৫৭ জেলায় প্রত্যেকটির জন্য ৫ লাখ টাকা করে নগদ ও ১০০ মেট্রিক টন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবারের ভারি বর্ষণে দেশের ৪৩টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি ওঠা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাব বলছে, ১ লক্ষ ১৪ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ফসল পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ, পেঁপে ও নানা ধরনের অর্থকরী ফসলের ব্যাপক ক্ষতি ঘটেছে।
ক্ষতির প্রধান হিসাবগুলো হলো:
– আউশ ধান: প্রায় ৭৯,৫০০ হেক্টর জমির আউশ ধান পানির নিচে পড়ে গেছে; অনেক ক্ষেতামেয় ধান পেকে যাওয়ার হামেশাই কৃষকরা ফসল তুলতে পারেনি।
– আমনের বীজতলা: ১০,৫০৪ হেক্টর বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে, যা আগামী আমন চাষকে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলবে।
– গ্রীষ্মকালীন সবজি: প্রায় ১৭,৮০০ হেক্টর জমির সবজি খেতে জলমগ্ন হয়ে পড়ে গেছে; কাঁচামরিচ, ঝিঙে, করলা, শসা ইত্যাদি প্রভাবিত হয়েছে, ফলে বাজার সরবরাহে প্রভাব পড়বে।
ক্ষতিগ্রস্তদের কষ্ট কাগজে-কলমে বোঝানো যায় না—মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা আরও ভেঙে দেওয়ার মতো। খুলনার বতিয়াঘাটা উপজেলার খলশিবুনিয়া গ্রামের কৃষক প্রসাদ রায়ের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি গত সপ্তাহে নিজের ১০ কাঠা জমিতে আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলেন; সেই বীজতলা কয়েকদিন টানা বর্ষণে পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছে। শ্যালো পাম্প দিয়ে পানির স্তর কমানোর চেষ্টা করেও মাঝের সমস্ত চারাগাছ পচে গেছে। তিনি বলছেন, ‘‘নতুন করে শুরু করতে হবে, বীজ কিনতে হবে—কিন্তু এখন টাকাও নেই, নির্মম অনিশ্চয়তা।’’
প্রসাদের মতো সমস্যার এক বড় কারণ হল মানবসৃষ্ট পরিবেশগত অবহেলা। তাঁর গ্রামের পাশের শালতা নদী গত কয়েক বছরে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে, এবং অঞ্চলের খালগুলো অবৈধভাবে দখল বা ভরাট করা হয়েছে—ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হচ্ছে না।
চক শৈলমারীর কৃষক মিরিন গোলদার আগাম শিম চাষ করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন; কিন্তু অতিবৃষ্টিতে তার মাঠের অর্ধেক চারা পচে গেছে। খুলনা জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী খুলনায় প্রায় ৩৪০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্র পানি নেমে স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রই পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।
পটুয়াখালীর কাহিনিও একই রকম। আউলিয়াপুর গ্রামের ফারুক হোসেনের একর জমির রোপা আমনের বীজতলা হাঁটু পানির নিচে পড়ে গেছে। বাউফল উপজেলার কাগজিরপুল এলাকার পানচাষিরা সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন; টানা বৃষ্টিতে বরজের মাটি নরম হয়ে ভেঙে পড়েছে এবং লতাগুলো পচে গেছে। এলাকার পানচাষিদের সম্মিলিত ক্ষতি প্রায় ১৭-২০ লাখ টাকার কাছাকাছি। ৭০ বছর বয়সি প্রবীণ চাষি বেলায়েত খান বলছেন, ‘‘আমার সারা জীবনের সঞ্চয় সেই বরজেই ছিল—সব শেষ হয়ে গেছে।’’
শ্রমজীবী মানুষেরা-ও ক্ষতিগ্রস্ত। পটুয়াখালীর রিকশাচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানিয়েছেন, বর্ষণের কারণে শহরের রাস্তাঘাট খালি, যাত্রী নেই, আয় অর্ধেকেরও কমে এসেছে। দিনমজুর, ভ্যানচালক, ফেরিওয়ালা—সবাই একই রকম আতঙ্ক ও আর্থিক চাপের মুখে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ক্ষতি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—দীর্ঘস্থায়ী হলে জাতীয় অর্থনীতি ও ভোক্তা বাজারেও প্রভাব পড়বে। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নির্ভর করবে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কতদিন স্থায়ী থাকে। দ্রুত পানি নেমে গেলেও কিছু ফসল পুনরুদ্ধারযোগ্য হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হলে আউশ, আমন ও সবজির বড় অংশই অপূরণীয়ভাবে নষ্ট হবে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতির প্রভাব মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না—দীর্ঘ পানির কারণে গ্রামীণ অঞ্চলে হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু, মৎস্যচাষের ঘের ও পশুখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় চাষিরা ঋণের দিকে আরও ঠেলে পড়ছেন।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ নিশ্চিত করেছেন, সরকার কৃষকের পাশে দাঁড়াবে এবং দ্রুত পুনর্বাসনের সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে যাতে কৃষকরা দ্রুত মাঠে ফিরে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীও স্থানীয় প্রশাসনকে জরুরি তথ্য সংগ্রহ ও দ্রুত বিতরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
রিপোর্টটি তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব ও পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























