০৯:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
অস্ট্রেলিয়ার স্টুডেন্ট ভিসা: বাংলাদেশি আবেদনকারীর অর্ধেকেরও বেশি প্রত্যাখ্যাত সংসদে নতুন রেকর্ড: ১৩ দিনে ৯১টি বিল পাস আবু সাঈদ হত্যা: ট্রাইব্যুনাল—২ পুলিশ সদস্যের ফাঁসি, তিনজনকে যাবজ্জীবন অর্থমন্ত্রী: ফ্যাসিবাদী সরকারের দুর্নীতি ও লুটপাটে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আবু সাঈদ হত্যা: ২ পুলিশকে ফাঁসি, ৩ জনকে যাবজ্জীবন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন: এনইআইআর নীতিমালা সংশোধন করা হবে জ্বালানি বিতরণে কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপের পাইলট চালু ঢাকায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য দূতের সাক্ষাৎ আনোয়ার ইব্রাহিম তারেক রহমানকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানালেন ঢাকায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য দূতের বৈঠক

অর্থমন্ত্রী: ফ্যাসিবাদী সরকারের দুর্নীতি ও লুটপাটে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দীর্ঘ দেড় দশকে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসের ধাক্কায় পড়ে গেছে এবং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও কার্যকারিতা হারিয়েছে। তিনি এই মন্তব্য করেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষিতে দেশকে সামনের পথে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি সংক্ষিপ্ত অর্থনৈতিক চিত্র জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর জনগণের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে কেন্দ্র করে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন।

আর্থিক ও অর্থনৈতিক সূচকে ব্যাপক বৈপরীত্যের দিকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ; আর মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৭ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.২২ শতাংশে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ১০.৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩.৫১ শতাংশে নেমে এসেছে, আর কৃষি প্রান্তে ৫.৭৭ শতাংশ থেকে ৩.৩০ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ কৃষিতে যুক্ত হচ্ছে; ফলে প্রকৃত অর্থে কর্মসংস্থান না থাকা সত্ত্বেও ছদ্মবেকারত্ব বাড়ছে। বর্তমানে কৃষিতে কর্মসংস্থান ৪১ শতাংশ হলেও জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান মাত্র ১১.৬ শতাংশ, যা নিম্ন উৎপাদনশীলতার সাক্ষ্য দেয়।

আরও তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, ২০০৫-০৬ সালে জাতীয় সঞ্চয় হার ছিল ২৯.৯৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে ২৮.৪২ শতাংশে নেমেছে। টাকার প্রতিনিধিত্বগত মূল্য ডলারের বিপরীতে ৬৭.২ টাকা থেকে খারাপ হয়ে ১২১ টাকায় গেছে, ফলে আমদানির বিল ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মুদ্রা সরবরাহ ও রিজার্ভ বৃদ্ধিও কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সঙ্কুচিত হয়েছে; ১৮.৩ শতাংশ থেকে নেমে এটি বর্তমানে ৬.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে — যা বিনিয়োগে স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি এবং বাজেট ঘাটতি বেড়ে প্রায় ৪.০৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনার যে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে তাও তিনি তুলে ধরেন। ২০০৫-০৬ সালে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা; কিন্তু ২০২৩-২৪ সালে সেটি বেড়ে হয়েছে ১,১৪৭ বিলিয়ন টাকা, ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে বিশেষত এসএমই উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে কষ্টে পড়ছেন।

রপ্তানি ও আমদানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার পাশাপাশি হুন্ডি ও অবৈধ অর্থপাচারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমে এসেছে; বর্তমান রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে তিনি যোগ করেন।

সমাধানের উদ্যোগ হিসেবে মন্ত্রী জানান, সরকার বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে। যেসব ‘জম্বি প্রকল্প’ — অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ফল দিচ্ছে না এবং বাজেট নিচ্ছে— সেগুলো চিহ্নিত করে বাতিল বা পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিকল্পিত সংস্কারের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সমাপ্তিতে তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে; ফ্যামিলি কার্ড বিতরণও তারই অংশ। ভবিষ্যৎ পথে স্থিতিশীলতা আনার জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

সংসদে নতুন রেকর্ড: ১৩ দিনে ৯১টি বিল পাস

অর্থমন্ত্রী: ফ্যাসিবাদী সরকারের দুর্নীতি ও লুটপাটে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

প্রকাশিতঃ ০২:২৭:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দীর্ঘ দেড় দশকে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসের ধাক্কায় পড়ে গেছে এবং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও কার্যকারিতা হারিয়েছে। তিনি এই মন্তব্য করেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষিতে দেশকে সামনের পথে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি সংক্ষিপ্ত অর্থনৈতিক চিত্র জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর জনগণের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে কেন্দ্র করে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন।

আর্থিক ও অর্থনৈতিক সূচকে ব্যাপক বৈপরীত্যের দিকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ; আর মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৭ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.২২ শতাংশে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ১০.৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩.৫১ শতাংশে নেমে এসেছে, আর কৃষি প্রান্তে ৫.৭৭ শতাংশ থেকে ৩.৩০ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ কৃষিতে যুক্ত হচ্ছে; ফলে প্রকৃত অর্থে কর্মসংস্থান না থাকা সত্ত্বেও ছদ্মবেকারত্ব বাড়ছে। বর্তমানে কৃষিতে কর্মসংস্থান ৪১ শতাংশ হলেও জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান মাত্র ১১.৬ শতাংশ, যা নিম্ন উৎপাদনশীলতার সাক্ষ্য দেয়।

আরও তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, ২০০৫-০৬ সালে জাতীয় সঞ্চয় হার ছিল ২৯.৯৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে ২৮.৪২ শতাংশে নেমেছে। টাকার প্রতিনিধিত্বগত মূল্য ডলারের বিপরীতে ৬৭.২ টাকা থেকে খারাপ হয়ে ১২১ টাকায় গেছে, ফলে আমদানির বিল ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মুদ্রা সরবরাহ ও রিজার্ভ বৃদ্ধিও কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সঙ্কুচিত হয়েছে; ১৮.৩ শতাংশ থেকে নেমে এটি বর্তমানে ৬.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে — যা বিনিয়োগে স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি এবং বাজেট ঘাটতি বেড়ে প্রায় ৪.০৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনার যে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে তাও তিনি তুলে ধরেন। ২০০৫-০৬ সালে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা; কিন্তু ২০২৩-২৪ সালে সেটি বেড়ে হয়েছে ১,১৪৭ বিলিয়ন টাকা, ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে বিশেষত এসএমই উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে কষ্টে পড়ছেন।

রপ্তানি ও আমদানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার পাশাপাশি হুন্ডি ও অবৈধ অর্থপাচারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমে এসেছে; বর্তমান রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে তিনি যোগ করেন।

সমাধানের উদ্যোগ হিসেবে মন্ত্রী জানান, সরকার বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে। যেসব ‘জম্বি প্রকল্প’ — অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ফল দিচ্ছে না এবং বাজেট নিচ্ছে— সেগুলো চিহ্নিত করে বাতিল বা পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিকল্পিত সংস্কারের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সমাপ্তিতে তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে; ফ্যামিলি কার্ড বিতরণও তারই অংশ। ভবিষ্যৎ পথে স্থিতিশীলতা আনার জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।