০৪:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
পরিবহন-লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী সৌদি আরব প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান: শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তুলুন পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী সৌদি আরব শিশুদের মানবিক গড়ে তোলায় শিক্ষকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান সৌদি আরব বাংলাদেশে পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: শিশুদের মানবিকভাবে গড়ুন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত নগর গড়তে কাজ করছে সরকার: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মানব পাচার ও প্রযুক্তি অপব্যবহার রোধে নতুন আইন কার্যকর হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির প্রয়াণে আজ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক এলডিসিদের টেকসই উত্তরণে বৈশ্বিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান

ভারতের নিষেধাজ্ঞায় বেনাপোলে রপ্তানি অর্ধেক: বাণিজ্যে ঘাটতির আশঙ্কা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও শর্তের ফলে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্যে আশঙ্কাজনক ধস দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের ভারতে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের পর থেকে প্রায় দুবছর পার হলেও ওই একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়নি; ফলশ্রুতিতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল মোট ৩,৮১,৪৪০ মেট্রিক টন। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় অর্ধেক কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১,৯২,০৮২ মেট্রিক টনে। এক বছরের ব্যবধানে বন্দর দিয়ে ভারতের জন্য বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ১,৮৯,৩৫৮ মেট্রিক টন কমেছে।

একমাত্র রপ্তানিই নয়, আমদানি-রপ্তানির অনুষঙ্গগত ভারসাম্যও ভাঙছে। দৈনন্দিন পণ্যবাহী ট্রাকের রেকর্ডে এ বৈষম্য প্রকটভাবে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একদিনে (সোমবার) ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল ৩০৫টি পণ্যবাহী ট্রাক; কিন্তু একই দিনে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৪৪টি ট্রাক পণ্য। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা ও শর্তই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এই বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতার মূল কারণ।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল ভারত সড়কপথে ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর পর ১৫ এপ্রিল সড়কপথে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং ১৭ মে জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনে স্থলপথে তৈরি পোশাক, সুতা, প্লাস্টিক, কাঠজাত পণ্য এবং ফল ও ফলজাত পণ্যের আমদানি–রফতানিতেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা বসানো হয়। এসব সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের কাজকর্ম সীমিত করে দিয়েছে এবং বেনাপোলের রপ্তানি ধারাকে নত করে দিয়েছে।

বেনাপোলের ব্যবসায়ী নেতারা ভারতের এই অনড় অবস্থাকে গভীর উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুর হক বলেন, নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করেছে; এর ফলে বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি প্রায় স্তব্ধের উপক্রম।

বেনাপোল সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ভারত যদি এভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে বাংলাদেশকে দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে হবে। তিনি সরকারকে ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া এবং তত্ক্ষণাৎ বিকল্প বাজার সম্প্রসারণ ও সমর্থনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

সংকট উত্তরণে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শও উঠে এসেছে। ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কমিটির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান (বিবিআইএন) ট্রানজিট সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে রপ্তানি বাড়ানো গেলে বর্তমান ঘাটতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন জানিয়েছেন, বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি ব্যাবসাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং পরিধি বাড়াতে কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাস্টমস, লজিস্টিক্স ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, এবং ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে বন্দরের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়ার চেষ্টা চলছে।

বাণিজ্যিকদের অনুজ্জীবিত অবস্থার মধ্যে কূটনৈতিক চাকা সচল রাখা, দ্রুত বিকল্প বাজার নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক ট্রানজিট সুবিধা বাস্তবায়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রেই একযোগে কাজ করলে বেনাপোল দিয়ে রপ্তানি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন। দ্রুত কার্যকরী সমাধান না হলে বাণিজ্য ঘাটতি দেশের আর্থিক ভারসাম্যকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান: শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তুলুন

ভারতের নিষেধাজ্ঞায় বেনাপোলে রপ্তানি অর্ধেক: বাণিজ্যে ঘাটতির আশঙ্কা

প্রকাশিতঃ ০২:২৪:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও শর্তের ফলে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্যে আশঙ্কাজনক ধস দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের ভারতে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের পর থেকে প্রায় দুবছর পার হলেও ওই একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়নি; ফলশ্রুতিতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল মোট ৩,৮১,৪৪০ মেট্রিক টন। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় অর্ধেক কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১,৯২,০৮২ মেট্রিক টনে। এক বছরের ব্যবধানে বন্দর দিয়ে ভারতের জন্য বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ১,৮৯,৩৫৮ মেট্রিক টন কমেছে।

একমাত্র রপ্তানিই নয়, আমদানি-রপ্তানির অনুষঙ্গগত ভারসাম্যও ভাঙছে। দৈনন্দিন পণ্যবাহী ট্রাকের রেকর্ডে এ বৈষম্য প্রকটভাবে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একদিনে (সোমবার) ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল ৩০৫টি পণ্যবাহী ট্রাক; কিন্তু একই দিনে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৪৪টি ট্রাক পণ্য। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা ও শর্তই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এই বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতার মূল কারণ।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল ভারত সড়কপথে ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর পর ১৫ এপ্রিল সড়কপথে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং ১৭ মে জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনে স্থলপথে তৈরি পোশাক, সুতা, প্লাস্টিক, কাঠজাত পণ্য এবং ফল ও ফলজাত পণ্যের আমদানি–রফতানিতেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা বসানো হয়। এসব সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের কাজকর্ম সীমিত করে দিয়েছে এবং বেনাপোলের রপ্তানি ধারাকে নত করে দিয়েছে।

বেনাপোলের ব্যবসায়ী নেতারা ভারতের এই অনড় অবস্থাকে গভীর উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুর হক বলেন, নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করেছে; এর ফলে বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি প্রায় স্তব্ধের উপক্রম।

বেনাপোল সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ভারত যদি এভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে বাংলাদেশকে দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে হবে। তিনি সরকারকে ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া এবং তত্ক্ষণাৎ বিকল্প বাজার সম্প্রসারণ ও সমর্থনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

সংকট উত্তরণে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শও উঠে এসেছে। ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কমিটির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান (বিবিআইএন) ট্রানজিট সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে রপ্তানি বাড়ানো গেলে বর্তমান ঘাটতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন জানিয়েছেন, বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি ব্যাবসাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং পরিধি বাড়াতে কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাস্টমস, লজিস্টিক্স ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, এবং ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে বন্দরের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়ার চেষ্টা চলছে।

বাণিজ্যিকদের অনুজ্জীবিত অবস্থার মধ্যে কূটনৈতিক চাকা সচল রাখা, দ্রুত বিকল্প বাজার নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক ট্রানজিট সুবিধা বাস্তবায়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রেই একযোগে কাজ করলে বেনাপোল দিয়ে রপ্তানি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন। দ্রুত কার্যকরী সমাধান না হলে বাণিজ্য ঘাটতি দেশের আর্থিক ভারসাম্যকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।