০২:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
এলডিসি উত্তরণে ইইউ ও জি-৭৭-এর সমর্থন নিশ্চিত লোভনীয় চাকরির ফাঁদ: কম্বোডিয়ার ‘সাইবার দাসত্বে’ বন্দি বাংলাদেশিরা এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশকে পাশে রাখবে ইইউ ও জি-৭৭ ইইউ ও জি-৭৭ দেশের এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়াতে সমর্থন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আড়ালে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায় কিছু মহল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আড়ালে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায় কিছু মহল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনলাইন জুয়ার লেনদেনে দিনে ৫ কোটি: টঙ্গী–কুমিল্লায় অভিযানে ছয় গ্রেফতার বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী পরিবহন-লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী সৌদি আরব

লোভনীয় চাকরির ফাঁদ: কম্বোডিয়ার ‘সাইবার দাসত্বে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

একটি মর্যাদার চাকরি, বাড়ির বোঝা হালকা করার স্বপ্ন—এই প্রতিশ্রুতিতেই অচেনা পথে পাড়ি দেয়েছিল তোফায়েল আহমেদ। স্নাতক শেষ, ছুটে থাকা দায়-দায়িত্ব; একটি চায়ের দোকানে পরিচিত দালাল তার সামনে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে বিদেশে দ্রুত ও ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখায়। শেষ পর্যন্ত ফকিরাপুলের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা দিয়ে সে রওনা দেয়। কিন্তু পৌঁছয়েই সব বদলে যায়। হাতে থাকা পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেওয়া হয়, মোবাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়, বিমানবন্দরে ওসতরাই দেয়া ২ হাজার ডলারও কে নিয়ে নেয়। বুঝতে না পেরে তোফায়েলকে নিয়ে যাওয়া হয় নির্জন পাহাড়ি এলাকা বা থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তের কাছে পাহারাবেষ্টিত বহুতলা ভবনে—যেখানে তিনি সহ শতশত বাংলাদেশিকে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ বলেই আটকে রেখে বাধ্য করা হয় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণা চালাতে।

এগুলো আর আলাদা কাহিনি নয়—এগুলো সমগ্রভাবে দাঁড়িয়েছে বড় এক মানহীন চক্রের রূপে। কম্বোডিয়ার এসব স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে বোরগোল দেওয়া ‘লাভ স্ক্যাম’ বা রোমান্টিক প্রতারণা অত্যন্ত সুসংঘঠিতভাবে পরিচালিত হয়। তরুণেরা সুন্দরামী কাহিনি ও ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ডেটিং অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলতে বাধ্য করা হয়। এরপর মূলত ইউরোপ, আমেরিকা বা উন্নত দেশের একাকী ও বয়স্ক মানুষদের টার্গেট করে দিন-রাত চ্যাট করে আস্থা অর্জন করা হয়; ভিডিওকল দেখিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়; শেষে ভুয়া ক্রিপ্টো বা ইনভেস্টমেন্ট স্কিম দেখিয়ে টাকা কামানোর চেষ্টা করা হয়। হ্যাকারদের সহযোগিতায় টার্গেটের ব্যাংক এক্সেস করে সম্পূর্ণ অ্যাকাউন্ট লুটে নেওয়া হয়।

স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরটা একেকটি দুর্গ—কাঁটাতার, সশস্ত্র প্রহরী, সিসিটিভি, লোহার গ্রিল-বাঁধা জানালা। প্রথম দুই-তিন দিন ভালো হোটেলে রাখা হলেও পরেরদিকেই তারা শহরতলায় কিংবা সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি স্থানে আটকানো হয়। প্রবেশদ্বারে ছবি তোলা, সবুজ সংকেত পেলে গেট পার করিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢুকেই পাসপোর্ট, ফোন আর টাকা হরণ করা হয় এবং তারা জানিয়ে দেয়, “আমরা তোমাকে কিনে নিয়েছি—এখন যা বলব তাই করবে।”

নির্যাতন ও দেবদাসিত্বের কাহিনি বারবার শোনা যায়। কাজের নির্দিষ্ট ‘টার্গেট’ দেওয়া থাকে—দিনে যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। তা না হলে শুরু হয় নৃশংস নির্যাতন: অন্ধকার কক্ষে বেঁধে বৈদ্যুতিক শক দেয়া, হকিস্টিক দিয়ে পেটানো, পানি বা খাবার বন্ধ রাখা—এসবের শিকার হয়াম-তরুণ-নারী সকলেই। তোফায়েল, তালাত মাহমুদ, ফরিদপুরের আল আমিন, মাইমুনা আক্তার মিলি—অনেকেই বছর পেরিয়ে বছর সেখানে বন্দি থেকে আসেন। দিন-রাত ১২–১৬ ঘন্টা কাজ করানো হয়; কখনও শুকনো নুডলস, মাঝে মাঝে পানি পর্যন্ত বঞ্চিত থাকতে হয়েছে অনেককে।

পলায়নের উপায় নগণ্য; মুক্তি পেতে প্রায়শই দিতে হয় মোটা মুক্তিপণ। তোফায়েল কষ্টসাধ্য উপায়ে বাংলাদেশ থেকে টাকা এনে নিজেই মুক্তি পেয়েছেন, তবু পাসপোর্ট বা বৈধ ভিসা না পেয়ে কম্বোডিয়ায় অনৈধভাবে অবস্থানকালে দৈনিক ১০ ডলার করে জরিমানায় ধরা পড়েন। তিনি ঢাকায় ফেরেন ১৪ জুন; দূতাবাসের সহায়তায় জরিমানা মওকুফ ও বিমানভাড়া জমিয়ে। একইভাবে ১ জুলাই সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয়ে ১০৯ জন বাংলাদেশি (যাদের মধ্যে ১০ জন নারী) ফিরেছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যে সম্প্রতি মোট ৫৮৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরত এসেছে। অপরদিকে বিওএমইটি (বিউরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং) জানায়, গত দেড় বছরে প্রায় ১৫,৯২১ জন বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন—এর মধ্যে কতজন ইন্টারনেট স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েছেন, তার পরিসংখ্যান মেলানো কঠিন।

আইনি বাধা ও প্রশাসনের সীমা: ভারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফিরলেও হাজিরা নেবার সংখ্যা অপেক্ষাকৃত নগণ্য। সিআইডির মানবপাচার ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অনেকে মামলা করতে চান না—হয়রানির ভয়ে কিংবা দ্রুত অর্থ বের করে পলাতক হলেই ভালো, এমন ভাব থাকে। পাচারকারীরাও কৌশল বদলায়: বাংলাদেশ সরকার যখন কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামে ভ্রমণে কড়াকড়ি বাড়ায়, তখন তারা জাল BMET কার্ড বানায় বা প্রথমে থাইল্যান্ড পাঠিয়ে সেখান থেকেই সড়কপথে কম্বোডিয়ায় ঢুকিয়ে দেয়। এমনকি বিমানবন্দরের ভিতরেই প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বোর্ডিং পাস করিয়ে দেয়ার ঘটনাও রিপোর্ট করা হয়েছে—এই গলদগুলোই অপরাধীদের কাজ চালাতে সহায়ক।

সমাধান ও প্রত্যাশা: সমস্যাটি কেবল অভিবাসন-সংক্রান্ত নয়; এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ও ডিজিটাল জালিয়াতির ব্যাপক নেটওয়ার্ক। সরকার ইতোমধ্যেই ভিসা যাচাই-বাছাই কঠোর করেছে এবং প্রবাসী কল্যাণ বিভাগ সচেতনতা বাড়াচ্ছে—তবু কেবল নীতিমালা যথেষ্ট নয়। বিমানবন্দর, এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় দূতাবাসের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং দালাল-চক্রের বিরুদ্ধে আন্তঃদেশীয় সমন্বয় জরুরি। দেশের সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় বিদেশ যাওয়া যুব সমাজকে সচেতন করতে হবে: প্রতিটি নিয়োগের কাগজপত্র, BMET ক্লিয়ারেন্স, বৈধ চুক্তি ও ভিসা যাচাই ছাড়া কারো কথা শুনবেন না। দালালদের ঘনিষ্ঠতার প্রলোভনে বা প্রথমে দেওয়া নগদ দেখে ভুয়া চাকরি-প্রস্তাব গ্রহণ করলে ভবিষ্যৎ কর্মজীবন হতে পারে সারা জীবনের ট্র্যাজেডি।

চূড়ান্তভাবে বলা যায়—তরুণদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আইননিিষ্ঠ ও সচেতন কর্তৃপক্ষ, শক্ত আইনি কাঠামো এবং নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা না বাড়ালে এই ‘সাইবার দাসত্ব’ নতুন করে আরও প্রাণঘাতী আকার নিতে পারে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

লোভনীয় চাকরির ফাঁদ: কম্বোডিয়ার ‘সাইবার দাসত্বে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

লোভনীয় চাকরির ফাঁদ: কম্বোডিয়ার ‘সাইবার দাসত্বে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

প্রকাশিতঃ ১০:৪১:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

একটি মর্যাদার চাকরি, বাড়ির বোঝা হালকা করার স্বপ্ন—এই প্রতিশ্রুতিতেই অচেনা পথে পাড়ি দেয়েছিল তোফায়েল আহমেদ। স্নাতক শেষ, ছুটে থাকা দায়-দায়িত্ব; একটি চায়ের দোকানে পরিচিত দালাল তার সামনে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে বিদেশে দ্রুত ও ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখায়। শেষ পর্যন্ত ফকিরাপুলের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা দিয়ে সে রওনা দেয়। কিন্তু পৌঁছয়েই সব বদলে যায়। হাতে থাকা পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেওয়া হয়, মোবাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়, বিমানবন্দরে ওসতরাই দেয়া ২ হাজার ডলারও কে নিয়ে নেয়। বুঝতে না পেরে তোফায়েলকে নিয়ে যাওয়া হয় নির্জন পাহাড়ি এলাকা বা থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তের কাছে পাহারাবেষ্টিত বহুতলা ভবনে—যেখানে তিনি সহ শতশত বাংলাদেশিকে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ বলেই আটকে রেখে বাধ্য করা হয় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণা চালাতে।

এগুলো আর আলাদা কাহিনি নয়—এগুলো সমগ্রভাবে দাঁড়িয়েছে বড় এক মানহীন চক্রের রূপে। কম্বোডিয়ার এসব স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে বোরগোল দেওয়া ‘লাভ স্ক্যাম’ বা রোমান্টিক প্রতারণা অত্যন্ত সুসংঘঠিতভাবে পরিচালিত হয়। তরুণেরা সুন্দরামী কাহিনি ও ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ডেটিং অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলতে বাধ্য করা হয়। এরপর মূলত ইউরোপ, আমেরিকা বা উন্নত দেশের একাকী ও বয়স্ক মানুষদের টার্গেট করে দিন-রাত চ্যাট করে আস্থা অর্জন করা হয়; ভিডিওকল দেখিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়; শেষে ভুয়া ক্রিপ্টো বা ইনভেস্টমেন্ট স্কিম দেখিয়ে টাকা কামানোর চেষ্টা করা হয়। হ্যাকারদের সহযোগিতায় টার্গেটের ব্যাংক এক্সেস করে সম্পূর্ণ অ্যাকাউন্ট লুটে নেওয়া হয়।

স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরটা একেকটি দুর্গ—কাঁটাতার, সশস্ত্র প্রহরী, সিসিটিভি, লোহার গ্রিল-বাঁধা জানালা। প্রথম দুই-তিন দিন ভালো হোটেলে রাখা হলেও পরেরদিকেই তারা শহরতলায় কিংবা সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি স্থানে আটকানো হয়। প্রবেশদ্বারে ছবি তোলা, সবুজ সংকেত পেলে গেট পার করিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢুকেই পাসপোর্ট, ফোন আর টাকা হরণ করা হয় এবং তারা জানিয়ে দেয়, “আমরা তোমাকে কিনে নিয়েছি—এখন যা বলব তাই করবে।”

নির্যাতন ও দেবদাসিত্বের কাহিনি বারবার শোনা যায়। কাজের নির্দিষ্ট ‘টার্গেট’ দেওয়া থাকে—দিনে যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। তা না হলে শুরু হয় নৃশংস নির্যাতন: অন্ধকার কক্ষে বেঁধে বৈদ্যুতিক শক দেয়া, হকিস্টিক দিয়ে পেটানো, পানি বা খাবার বন্ধ রাখা—এসবের শিকার হয়াম-তরুণ-নারী সকলেই। তোফায়েল, তালাত মাহমুদ, ফরিদপুরের আল আমিন, মাইমুনা আক্তার মিলি—অনেকেই বছর পেরিয়ে বছর সেখানে বন্দি থেকে আসেন। দিন-রাত ১২–১৬ ঘন্টা কাজ করানো হয়; কখনও শুকনো নুডলস, মাঝে মাঝে পানি পর্যন্ত বঞ্চিত থাকতে হয়েছে অনেককে।

পলায়নের উপায় নগণ্য; মুক্তি পেতে প্রায়শই দিতে হয় মোটা মুক্তিপণ। তোফায়েল কষ্টসাধ্য উপায়ে বাংলাদেশ থেকে টাকা এনে নিজেই মুক্তি পেয়েছেন, তবু পাসপোর্ট বা বৈধ ভিসা না পেয়ে কম্বোডিয়ায় অনৈধভাবে অবস্থানকালে দৈনিক ১০ ডলার করে জরিমানায় ধরা পড়েন। তিনি ঢাকায় ফেরেন ১৪ জুন; দূতাবাসের সহায়তায় জরিমানা মওকুফ ও বিমানভাড়া জমিয়ে। একইভাবে ১ জুলাই সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয়ে ১০৯ জন বাংলাদেশি (যাদের মধ্যে ১০ জন নারী) ফিরেছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যে সম্প্রতি মোট ৫৮৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরত এসেছে। অপরদিকে বিওএমইটি (বিউরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং) জানায়, গত দেড় বছরে প্রায় ১৫,৯২১ জন বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন—এর মধ্যে কতজন ইন্টারনেট স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েছেন, তার পরিসংখ্যান মেলানো কঠিন।

আইনি বাধা ও প্রশাসনের সীমা: ভারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফিরলেও হাজিরা নেবার সংখ্যা অপেক্ষাকৃত নগণ্য। সিআইডির মানবপাচার ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অনেকে মামলা করতে চান না—হয়রানির ভয়ে কিংবা দ্রুত অর্থ বের করে পলাতক হলেই ভালো, এমন ভাব থাকে। পাচারকারীরাও কৌশল বদলায়: বাংলাদেশ সরকার যখন কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামে ভ্রমণে কড়াকড়ি বাড়ায়, তখন তারা জাল BMET কার্ড বানায় বা প্রথমে থাইল্যান্ড পাঠিয়ে সেখান থেকেই সড়কপথে কম্বোডিয়ায় ঢুকিয়ে দেয়। এমনকি বিমানবন্দরের ভিতরেই প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বোর্ডিং পাস করিয়ে দেয়ার ঘটনাও রিপোর্ট করা হয়েছে—এই গলদগুলোই অপরাধীদের কাজ চালাতে সহায়ক।

সমাধান ও প্রত্যাশা: সমস্যাটি কেবল অভিবাসন-সংক্রান্ত নয়; এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ও ডিজিটাল জালিয়াতির ব্যাপক নেটওয়ার্ক। সরকার ইতোমধ্যেই ভিসা যাচাই-বাছাই কঠোর করেছে এবং প্রবাসী কল্যাণ বিভাগ সচেতনতা বাড়াচ্ছে—তবু কেবল নীতিমালা যথেষ্ট নয়। বিমানবন্দর, এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় দূতাবাসের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং দালাল-চক্রের বিরুদ্ধে আন্তঃদেশীয় সমন্বয় জরুরি। দেশের সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় বিদেশ যাওয়া যুব সমাজকে সচেতন করতে হবে: প্রতিটি নিয়োগের কাগজপত্র, BMET ক্লিয়ারেন্স, বৈধ চুক্তি ও ভিসা যাচাই ছাড়া কারো কথা শুনবেন না। দালালদের ঘনিষ্ঠতার প্রলোভনে বা প্রথমে দেওয়া নগদ দেখে ভুয়া চাকরি-প্রস্তাব গ্রহণ করলে ভবিষ্যৎ কর্মজীবন হতে পারে সারা জীবনের ট্র্যাজেডি।

চূড়ান্তভাবে বলা যায়—তরুণদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আইননিিষ্ঠ ও সচেতন কর্তৃপক্ষ, শক্ত আইনি কাঠামো এবং নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা না বাড়ালে এই ‘সাইবার দাসত্ব’ নতুন করে আরও প্রাণঘাতী আকার নিতে পারে।