১০:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে অর্থনীতি নাজুক নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি জরুরি চ্যালেঞ্জ ড. ইউনূস লাল পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করবে না সরকার: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কারও চাঁদাবাজি করার সুযোগ নেই: সড়ক পরিবহণমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিঠি, অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি শিক্ষাকে রাজনীতির বাইরেই রাখবে সরকার: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ড. ইউনূসসহ বিদায়ী উপদেষ্টারা কূটনৈতিক পাসপোর্ট হস্তান্তর রমজানেই শুরু হবে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প

নিষেধাজ্ঞা ডিঙিয়ে চীন হয়ে রাশিয়ায় বিদেশী গাড়ির বিক্রি বেড়ে যাচ্ছে

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও বাস্তব পরিস্থিতি তার বিপরীতে দেখাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। বিশেষ করে অটোমোবাইল শিল্পে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, এর পেছনে রয়েছে চীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশাল এক ‘গ্রে মার্কেট’ বা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যপথের দৃঢ়তা। বাণিজ্যর এই ধারাটি রুশ বাজারে আধুনিক ব্র্যান্ডের গাড়ি সহজে এবং নিয়মিত প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। টয়োটা, মাজদা, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউসহ বিশ্বখ্যাত অনেক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি সরাসরি রফতানি বন্ধ করলেও তাদের গাড়ি এখন চীনের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার শোরুমগুলোতে পৌঁছাচ্ছে। রাশিয়ার একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী রিপোর্টের মাধ্যমে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার ঝামেলা এড়িয়ে বিকল্প উপায়ে রুশ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই চাঞ্চল্যকর বাণিজ্য চলমান রয়েছে।

অটোমোবাইল গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অটোস্ট্যাট’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমা ও জাপানিজ কোম্পানিরা তাদের সরাসরি রাশিয়া ব্যবসা বন্ধ করলেও রুশ উপভোক্তাদের গাড়ির চাহিদা কোনভাবেই কমেনি। বরং, রুশ ডিলাররা এখন সরাসরি নির্মাতাদের উপর না ভর করে চীনের শক্তিশালী ব্যবসায়ী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গাড়ি সংগ্রহ করছে। এই অপারেশনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চীনে তৈরি বিদেশি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের গাড়ি। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর চীনা অংশীদারদের সঙ্গে মিলে স্থানীয় বাজারের জন্য গাড়ি তৈরি হলেও অনেক গাড়ি কৌশলে রাশিয়ার সীমান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। এছাড়া, বিশ্বের অন্যান্য দেশের উৎপাদিত গাড়িও চীনের বন্দর নৌপথে ট্রানজিট করে মস্কো পৌঁছাচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার কঠোর আইনি জটিলতা এড়াতে ব্যবসায়ীরা প্রাচীন ও চটচটে কৌশল অবলম্বন করছে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নতুন ও চকচকে গাড়িগুলো প্রথমে কাগজে-কলমে ‘ব্যবহৃত গাড়ি’ হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়। চীনে প্রথম নিবন্ধনের পর, সেগুলোকে দ্বিতীয় হাত বা ব্যবহৃত হিসেবে দেখিয়ে রাশিয়ায় রফতানি করা হয়। এর ফলে মূল গাড়ির নির্মাতা সংস্থাগুলোর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না এবং তারা আইনি জোট থেকে রক্ষা পায়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে রাশিয়ায় বিক্রিত প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বিদেশি গাড়ির অর্ধেকের বেশি এই চীনের পথ দিয়ে প্রবেশ করছে। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পদ্ধতিতে রাশিয়ায় সাত লাখের বেশি বিদেশি ব্র্যান্ডের গাড়ি বিক্রি হয়েছে।

এদিকে, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ ও ফক্সওয়াগনের মতো বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করছে, তারা পুরোপুরি রাশিয়ায় পণ্য বিক্রি বন্ধ রেখেছেন এবং অনিয়মিত রফতানি বন্ধে তৎপর। তবে, তারা স্বীকার করছে, তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে গোপন এই সরবরাহ বন্ধ করা বেশ কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। বিএমডব্লিউ জানিয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এইসব গাড়ির রাশিয়ায় প্রবেশ। রুশ ডিলাররা বলছেন, ধনী গ্রাহকদের মধ্যে পশ্চিমা ব্র্যান্ডের গাড়ির প্রতি বিশেষ আগ্রহ থাকায় তারা এই ‘প্যারালাল ইমপোর্ট’ বা পার্শ্বপ্রবাহ চালু রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্ররাও এই গোপন বাণিজ্য রোধে নজরদারি বাড়িয়েছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিকল্প পথের সংখ্যা এত বেশি যে এটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা কঠিন। চীন এখন বিশাল এক গাড়ি বাজার বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি, সরকারের বিভিন্ন রকম ভর্তুকি সুবিধা থেকেও উপযুক্ত সুবিধা নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। ফলে বিশ্ব রাজনীতি ও নিষেধাজ্ঞার এই পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে রাশিয়ায় এখনো দামী ও আধুনিক মডেলের বিদেশি গাড়ি চলাফেরা করছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এক অনন্য প্রমাণ। এই বিষয়টি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দাঁড়িয়েছে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে অর্থনীতি নাজুক

নিষেধাজ্ঞা ডিঙিয়ে চীন হয়ে রাশিয়ায় বিদেশী গাড়ির বিক্রি বেড়ে যাচ্ছে

প্রকাশিতঃ ১১:৫২:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও বাস্তব পরিস্থিতি তার বিপরীতে দেখাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। বিশেষ করে অটোমোবাইল শিল্পে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, এর পেছনে রয়েছে চীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশাল এক ‘গ্রে মার্কেট’ বা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যপথের দৃঢ়তা। বাণিজ্যর এই ধারাটি রুশ বাজারে আধুনিক ব্র্যান্ডের গাড়ি সহজে এবং নিয়মিত প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। টয়োটা, মাজদা, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউসহ বিশ্বখ্যাত অনেক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি সরাসরি রফতানি বন্ধ করলেও তাদের গাড়ি এখন চীনের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার শোরুমগুলোতে পৌঁছাচ্ছে। রাশিয়ার একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী রিপোর্টের মাধ্যমে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার ঝামেলা এড়িয়ে বিকল্প উপায়ে রুশ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই চাঞ্চল্যকর বাণিজ্য চলমান রয়েছে।

অটোমোবাইল গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অটোস্ট্যাট’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমা ও জাপানিজ কোম্পানিরা তাদের সরাসরি রাশিয়া ব্যবসা বন্ধ করলেও রুশ উপভোক্তাদের গাড়ির চাহিদা কোনভাবেই কমেনি। বরং, রুশ ডিলাররা এখন সরাসরি নির্মাতাদের উপর না ভর করে চীনের শক্তিশালী ব্যবসায়ী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গাড়ি সংগ্রহ করছে। এই অপারেশনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চীনে তৈরি বিদেশি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের গাড়ি। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর চীনা অংশীদারদের সঙ্গে মিলে স্থানীয় বাজারের জন্য গাড়ি তৈরি হলেও অনেক গাড়ি কৌশলে রাশিয়ার সীমান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। এছাড়া, বিশ্বের অন্যান্য দেশের উৎপাদিত গাড়িও চীনের বন্দর নৌপথে ট্রানজিট করে মস্কো পৌঁছাচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার কঠোর আইনি জটিলতা এড়াতে ব্যবসায়ীরা প্রাচীন ও চটচটে কৌশল অবলম্বন করছে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নতুন ও চকচকে গাড়িগুলো প্রথমে কাগজে-কলমে ‘ব্যবহৃত গাড়ি’ হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়। চীনে প্রথম নিবন্ধনের পর, সেগুলোকে দ্বিতীয় হাত বা ব্যবহৃত হিসেবে দেখিয়ে রাশিয়ায় রফতানি করা হয়। এর ফলে মূল গাড়ির নির্মাতা সংস্থাগুলোর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না এবং তারা আইনি জোট থেকে রক্ষা পায়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে রাশিয়ায় বিক্রিত প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বিদেশি গাড়ির অর্ধেকের বেশি এই চীনের পথ দিয়ে প্রবেশ করছে। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পদ্ধতিতে রাশিয়ায় সাত লাখের বেশি বিদেশি ব্র্যান্ডের গাড়ি বিক্রি হয়েছে।

এদিকে, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ ও ফক্সওয়াগনের মতো বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করছে, তারা পুরোপুরি রাশিয়ায় পণ্য বিক্রি বন্ধ রেখেছেন এবং অনিয়মিত রফতানি বন্ধে তৎপর। তবে, তারা স্বীকার করছে, তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে গোপন এই সরবরাহ বন্ধ করা বেশ কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। বিএমডব্লিউ জানিয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এইসব গাড়ির রাশিয়ায় প্রবেশ। রুশ ডিলাররা বলছেন, ধনী গ্রাহকদের মধ্যে পশ্চিমা ব্র্যান্ডের গাড়ির প্রতি বিশেষ আগ্রহ থাকায় তারা এই ‘প্যারালাল ইমপোর্ট’ বা পার্শ্বপ্রবাহ চালু রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্ররাও এই গোপন বাণিজ্য রোধে নজরদারি বাড়িয়েছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিকল্প পথের সংখ্যা এত বেশি যে এটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা কঠিন। চীন এখন বিশাল এক গাড়ি বাজার বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি, সরকারের বিভিন্ন রকম ভর্তুকি সুবিধা থেকেও উপযুক্ত সুবিধা নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। ফলে বিশ্ব রাজনীতি ও নিষেধাজ্ঞার এই পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে রাশিয়ায় এখনো দামী ও আধুনিক মডেলের বিদেশি গাড়ি চলাফেরা করছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এক অনন্য প্রমাণ। এই বিষয়টি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দাঁড়িয়েছে।