০৯:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
২৩ কোটি টাকা মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে নূরুল ইসলাম মনি ত্রয়োদশ সংসদের চীফ হুইপ নিযুক্ত ডুবোচর ও বর্জ্যে ইলিশহীন পায়রা, সংকটে ১৪,৬৮৯ জেলে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সৌজন্য সাক্ষাৎ নরসিংদীতে কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা: এজাহারভুক্ত আরও এক আসামি গ্রেফতার মিশরের প্রেসিডেন্ট আল-সিসি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী: নিজেকে দক্ষ ও মানবিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী: নিজেকে দক্ষ ও মানবিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলুন মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আটকা পড়া প্রবাসীদের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে

মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তি উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে নড়বড় করে তুলতে পারে — আর তার সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। শ্রমবাজারে আঘাত, জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহে বিঘ্ন, এলএনজির দাম বাড়াসহ সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রতিকূলতা—এসবই বিশেষজ্ঞেরা মূল ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে এর প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হবে।

অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, ইরানের ওপর হামলার পর জ্বালানি তেলের বাজারই সবচে̌ বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে সমস্যা হলে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে এবং দাম ঝটপট বাড়তে পারে। বাংলাদেশ শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদন ও পরিবহন খাতে সরাসরি পড়বে। ফলে সার্বিক দাম বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যয় চাপ নিবে।

আবু আহমেদ আরও বলেন, তেলের দাম বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের ব্যালান্স অব পেমেন্ট ইতিমধ্যেই চাপের মুখে আছে; তেলের উচ্চমূল্য ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে টাকার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে বিনিময় হার দুর্বল হতে পারে এবং আমদানি ও ঋণ servicing কঠিন হয়ে পড়বে।

সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ওপর এই সংঘাতের প্রভাব সরাসরি ও বহুমুখী। ফলে যুদ্ধের স্থায়িত্ব ও বিস্তৃতি নির্ভর করে চূড়ান্ত প্রভাব কতটা গম্ভীর হবে। যুদ্ধ দ্রুত স্থবির না হলে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি বাজারে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে—তাই প্রয়োজন পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি।

শিল্প-রপ্তানিকারকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও জ্বালানির খরচ বাড়লে পোশাক শিল্পসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং বৈদেশিক ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমলে রপ্তানি আঘাত পেতে পারে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে জাহাজগুলো দীর্ঘ পথ ফিরতে হলে পরিবহন খরচ বাড়বে; পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় কার্গো বিমানের পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত প্রেরণীয় পণ্য রপ্তানিতে সমস্যা ঘটবে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পোশাক রপ্তানিকারী হিসেবে আমাদের জন্য এ ধরনের উত্তেজনা বড় ঝুঁকি। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হলে খরচ ও সময়সীমা মারাত্মকভাবে বাড়বে।

শ্রমিক ও রেমিট্যান্স সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে। বায়রা’র সাবেক কর্মকর্তা মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড়াবে; শ্রমিকদের দেশে ফেরত আসা হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়বে। তিনি বলছেন, সরকারের উচিত প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হটলাইন চালু রাখা এবং ফেরত না যেতে পরামর্শ ও সহায়তা দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।

জ্বালানি আমদানির বিষয়টি সংস্থাগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে এবং এর বেশিরভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার দেশগুলো থেকে। বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, আপাতত জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেলের কোনো তাত্ক্ষণিক সংকট নেই, কারণ তা মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে; তবু অপরিশোধিত তেলের দীর্ঘমেয়াদি উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নির্ভরশীল হওয়ায় বিষয়টি নজরে রাখা হচ্ছে।

পরিবহন খাতেও অস্থিরতা ধরা পড়ছে। বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পণ্য পরিবহনে বড় প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে ইয়েমেনের হুতিদের হামলার পর লোহিত সাগর পথ কম ব্যবহার করা হয়েছে; যদি সংঘর্ষ আরো বড় আকার নেয় বা রাশিয়া-চীন জড়িয়ে পড়ে, পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিশেষজ্ঞরা মিলে বলেন, বর্তমানে ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের কাছে কয়েকটি অগ্রাধিকার আছে — জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখা, রেমিট্যান্স ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রপ্তানিখাতে সহায়তা বাড়ানো এবং বিকল্প রুট ও সরবরাহ উৎস খুঁজে সংকট সম্ভাব্যতা কমানো। যুদ্ধ দ্রুত থেমে গেলে ক্ষতিপূরণ সীমিত রাখা যাবে, কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতির ওপর প্রভাব তীব্র ও বহুমুখী হবে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

২৩ কোটি টাকা মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে

প্রকাশিতঃ ০৮:২৭:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তি উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে নড়বড় করে তুলতে পারে — আর তার সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। শ্রমবাজারে আঘাত, জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহে বিঘ্ন, এলএনজির দাম বাড়াসহ সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রতিকূলতা—এসবই বিশেষজ্ঞেরা মূল ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে এর প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হবে।

অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, ইরানের ওপর হামলার পর জ্বালানি তেলের বাজারই সবচে̌ বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে সমস্যা হলে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে এবং দাম ঝটপট বাড়তে পারে। বাংলাদেশ শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদন ও পরিবহন খাতে সরাসরি পড়বে। ফলে সার্বিক দাম বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যয় চাপ নিবে।

আবু আহমেদ আরও বলেন, তেলের দাম বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের ব্যালান্স অব পেমেন্ট ইতিমধ্যেই চাপের মুখে আছে; তেলের উচ্চমূল্য ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে টাকার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে বিনিময় হার দুর্বল হতে পারে এবং আমদানি ও ঋণ servicing কঠিন হয়ে পড়বে।

সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ওপর এই সংঘাতের প্রভাব সরাসরি ও বহুমুখী। ফলে যুদ্ধের স্থায়িত্ব ও বিস্তৃতি নির্ভর করে চূড়ান্ত প্রভাব কতটা গম্ভীর হবে। যুদ্ধ দ্রুত স্থবির না হলে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি বাজারে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে—তাই প্রয়োজন পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি।

শিল্প-রপ্তানিকারকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও জ্বালানির খরচ বাড়লে পোশাক শিল্পসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং বৈদেশিক ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমলে রপ্তানি আঘাত পেতে পারে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে জাহাজগুলো দীর্ঘ পথ ফিরতে হলে পরিবহন খরচ বাড়বে; পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় কার্গো বিমানের পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত প্রেরণীয় পণ্য রপ্তানিতে সমস্যা ঘটবে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পোশাক রপ্তানিকারী হিসেবে আমাদের জন্য এ ধরনের উত্তেজনা বড় ঝুঁকি। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হলে খরচ ও সময়সীমা মারাত্মকভাবে বাড়বে।

শ্রমিক ও রেমিট্যান্স সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে। বায়রা’র সাবেক কর্মকর্তা মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড়াবে; শ্রমিকদের দেশে ফেরত আসা হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়বে। তিনি বলছেন, সরকারের উচিত প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হটলাইন চালু রাখা এবং ফেরত না যেতে পরামর্শ ও সহায়তা দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।

জ্বালানি আমদানির বিষয়টি সংস্থাগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে এবং এর বেশিরভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার দেশগুলো থেকে। বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, আপাতত জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেলের কোনো তাত্ক্ষণিক সংকট নেই, কারণ তা মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে; তবু অপরিশোধিত তেলের দীর্ঘমেয়াদি উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নির্ভরশীল হওয়ায় বিষয়টি নজরে রাখা হচ্ছে।

পরিবহন খাতেও অস্থিরতা ধরা পড়ছে। বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পণ্য পরিবহনে বড় প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে ইয়েমেনের হুতিদের হামলার পর লোহিত সাগর পথ কম ব্যবহার করা হয়েছে; যদি সংঘর্ষ আরো বড় আকার নেয় বা রাশিয়া-চীন জড়িয়ে পড়ে, পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিশেষজ্ঞরা মিলে বলেন, বর্তমানে ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের কাছে কয়েকটি অগ্রাধিকার আছে — জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখা, রেমিট্যান্স ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রপ্তানিখাতে সহায়তা বাড়ানো এবং বিকল্প রুট ও সরবরাহ উৎস খুঁজে সংকট সম্ভাব্যতা কমানো। যুদ্ধ দ্রুত থেমে গেলে ক্ষতিপূরণ সীমিত রাখা যাবে, কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতির ওপর প্রভাব তীব্র ও বহুমুখী হবে।