বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দল জনগণের কাছে যে ‘জুলাই সনদ’ে স্বাক্ষর করেছে, তার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর এবং প্রতিটি লাইন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সোমবার (২০ এপ্রিল) বিকেলে বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত জনসভায় তিনি হাজারো মানুষের সামনে এ ঘোষণা দেন।
তারেক রহমান আরও বলেন, আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি যে জুলাই সনদে সই করেছে, সেটি আমরা ইনশাআল্লাহ বাস্তবায়ন করব। জনসভায় তিনি দেশের চলমান রাজনীতিসহ কমিশনভিত্তিক বিভিন্ন প্রস্তাবের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
চেয়ারমান জানান, অতীতে ১১টি জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়েছিল; যার মধ্যে সাংবিধানিক, বিচারমূলক, প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য ও নারী বিষয়ক কমিশন ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মহল এসব ‘সংস্কার’কে ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, বিশেষত জুলাই সনদের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু, তিনি বলেন, তারা নারী স্বাধীনতা, নারীর উন্নয়ন বা জনসাধারণের চিকিৎসাসহ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার কথা বলে না।
তারেক বলেন, দেশের মানুষের সুবিধার জন্য যে চিকিৎসা কমিশন গঠন করা হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে ওষুধ ও চিকিৎসা পায়—তার ব্যাপারে কিছু বলা হয় না। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ঠিক করার বা কৃষি ও সামাজিক সেবার উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলিতেও তাদের কোনো বক্তব্য নেই; তারা শুধু সংবিধান সম্পর্কে কথা বলেছেন।
জনসভা শুরুর বেশ আগে দুপুর থেকেই নেতা-কর্মীরা ছোট ছোট মিছিল করে আলতাফুন্নেছা মাঠে সমবেত হতে থাকে। শুরুর দিকে দ্রুত ভিড় বাড়তে থাকে এবং বেলা ৩টার মধ্যে মাঠ প্রাঙ্গণ আগুনে-হইতে জনসমুদ্রে পরিণত হয়; আশপাশের সড়কেও ভীড় লক্ষ্য করা গেছে।
তারেকের বগুড়া সফরটি তার নিজ জেলা বগুড়ায় কর্মসূচি ও জনসংযোগভিত্তিক একটি সফর ছিল। সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে তিনি ঢাকার গুলশান থেকে সড়ক পথে বগুড়া সার্কিট হাউসে পৌঁছান, যেখানে জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। তার সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।
বক্তব্যে তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে বিএনপির অসংখ্য জনকর্মী দমন-নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন; তখন দেশের মানুষের বাকস্বাধীন্য ও ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আন্দোলন গঠন করলে গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা সম্ভব হয়েছিল।
তারেক আরও অভিযোগ করেন, স্বৈরাচার আমলে মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে দুর্নীতি হয়েছে এবং লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে ম্যান্ডেট দিয়েছে এবং এই ম্যান্ডেট নিয়ে দেশের উন্নয়নের কাজ শুরু করা হবে—নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা অটল। ইতিমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড জারি করা হয়েছে এবং কৃষি ঋণসহ কিছু ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মগুরুরা সম্মানী পাচ্ছেন।
বক্তব্যে তিনি জানান, সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে এবং স্বল্প খরচে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে; অচিরেই সুখবর আসবে। তিনি ২০১৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া যে সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, পরে বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব পেশ করে—এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।
উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য রপ্তানির সুবিধার্থে বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো বিমান চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে—এ ঘোষণা দেন তারেক। সঙ্গে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং সেখানে কৃষিসহ বিভিন্ন বিভাগ চালুর প্রতিজ্ঞা জানান।
জনসভায় বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা সভাপতিত্ব করেন। তারেকের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত থেকে সমর্থন দেন। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।
জনসভা ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় তারেক বগুড়া প্রেসক্লাবের নবনির্মিত ভবন ও বাইতুল রহমতান সেন্ট্রাল জামে মসজিদের পুনর্নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। দিনভর তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন; বেলা ১১টায় বগুড়া বারের নবনির্মিত বহুতল ভবনের নাম ফলক উন্মোচন করেন এবং এরপর সাত জেলায় ই-বেলবন্ড কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় আইনমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসনের কর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পৌর ভবনে ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বহুদিনের দাবি আজ পূরণ হয়েছে—বগুড়া পৌরসভা সিটি করপোরেশনের মর্যাদা পেল এবং এটি দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
এরপর তিনি গাছরোপণ ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন করেন এবং গাবতলী উপজেলায় ৯১১ পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। দুপুরে বাগবাড়ীতে জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতাল মণ্ডলে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনও করেন। এছাড়া খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন ও নশিপুরে খননকাজের সিমেন্টিং কার্যক্রমের সূচনা করেন। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসন ও অন্যান্য নেতা-কর্মীরা তার সঙ্গে ছিলেন।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























