ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের উত্থানশীল শক্তি নরওয়ে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সেলেসাওদের সামনে কেবল পুরনো পরিসংখ্যানই সমস্যা নয়—বর্তমান নরওয়ে দলটির আক্রমণাত্মক শক্তি ব্রাজিলের জন্য বড়ই চিন্তার কারণ।
ইতিহাসগত দিক থেকে নিয়োগ করলে ব্রাজিল কখনো নরওয়েকে হারাতে পারেনি—চারটি সামনাসামনি ম্যাচে ব্রাজিল দুইবার পরাজিত ও দুইবার ড্র করেছে। তবে ফর্মের ভাষায় বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা: প্রথম খেলাটা প্রায় ৩৮ বছর আগের এবং সর্বশেষ মিটিংটি ছিল ২০০৬ সালে। তাই ধারাবাহিকভাবে নরওয়ের কাছে পরাজয়—এমন কথা বলা যায় না। ব্রাজিলের মূল উদ্বেগ হচ্ছে ১৯৯৮ সালের পর থেকে নরওয়ে ফুটবলে যে নীরব কিন্তু গভীর রূপান্তর ঘটেছে, সেটিই এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
ও গ্লোবো’র বিশিষ্ট কলামিস্ট কার্লোস এদুয়ার্দোর ভাষ্য অনুযায়ী, ৯০-এর দশকের রক্ষণভিত্তিক নরওয়ে এখন আর নেই—বর্তমান দলে আক্রমণাত্মক খেলা, আধুনিকতা ও গতিসম্পন্নতার মিশেল রয়েছে যা আন্তর্জাতিক মানের যে কোনো দলের বিপদ বাড়াতে পারে। পূর্বের চারটি ম্যাচের তিনটিই ওসলোতেই হয়েছে, নরওয়ের পরিচিত পরিবেশে; কিন্তু এইবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আবহাওয়া পুরোপুরি আলাদা। আবহাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ম্যাচের দিন তীব্র গরম থাকবে, যা দুই দলের জন্যই অতিরিক্ত প্রাচীর হিসেবে কাজ করতে পারে।
১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে নরওয়ের ব্রাজিলবিরোধী সফলতা এসেছিল কিংবদন্তি কোচ এগিল “ড্রিলো”র কড়া কৌশলের ফল—রক্ষণভাগ সুশৃঙ্খল রেখে উইং থেকে দ্রুত কাউন্টার, যেখানে ফরওয়ার্ডদের শারীরিকতা ও গতি কাজে লাগানো হত। মজার ঘটনাই হলো, ২০২৬ সালের এই দলটিও মূলত একই ধারণায় খেলছে, কিন্তু আক্রমণের ধার এখন অনেক গুণে ভারী ও ধারালো।
সময়ের বড় নাম টোরে আন্দ্রে ফ্লো ছিল সেই ধারার প্রতিনিধি—ব্রাজিলের বিপক্ষে তিনি দুই ম্যাচে তিন গোল করেছিলেন। ১.৯৩ মিটার উচ্চতার ফ্লো তাঁর গতি ও শরীরি শক্তির জন্য চিহ্নিত ছিলেন, তবে বর্তমান দলটির আক্রমণশক্তি সেই সময়কার তুলনায় অনেক বেশি পরিণত। তাদের নেতা আর্লিং হালান্ডের গোলগতি বিরল—চলমান সময়ে ১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ২৬ গোলসহ তিনি দ্রুততম হিসেবে ৬০ গোলের রেকর্ডও গড়েছেন; বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ১৬ গোল ও চলতি বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই ৫টি গোল করে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে আছেন। (উল্লেখিত পরিসংখ্যানগুলো ম্যাচ পূর্বের পরিস্থিতি অনুসারে দেওয়া হয়েছে।)
হালান্ডের পাশে মার্টিন ওডেগার্ড, আলেকজান্দার সোরলোথ, অ্যান্তনিও নুসা ও অস্কার ববের মতো খেলোয়াড়রা নরওয়ের আক্রমণকে বৈচিত্র্য ও ধারালো চিন্তা দিয়েছে। এই দলটির ওয়ান-অন-ওয়ান ড্রিবলিং, দ্রুত পাসিং-মুভমেন্ট ও ব্যক্তিগত দক্ষতা ৯০-এর দশকের নরওয়ের চেয়েও অনেক এগিয়ে। বিশ্লেষক মানসুরের কথায়, বর্তমান নরওয়ে যেকোনো বিশ্বমানের ফুলব্যাককে একের পর এক এক নয়নাভিরাম ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করে ফেলতে সক্ষম।
ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির সামনে তাই চ্যালেঞ্জটি দ্বিগুণ—একদিকে পুরনো অপূর্ণ ইতিহাস মুছতে হবে, অন্যদিকে সাম্বার লড়াকু শৈলীকে হালান্ড ও তাঁর আশেপাশের তরুণ নর্ডিক আক্রমণের সাথে কৌশলে টেক্কা দিতে হবে। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠার লড়াইটা কেবল কৌশল নয়, মানসিকতা, আবহাওয়া ও একদিনের ফর্মেরও পরীক্ষা হবে।
ফুটবল বিশ্ব এই মুখোমুখির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে—আনচেলত্তির সাম্বা নাকি হালান্ডের নর্ডিক ঝড় শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে, তা নির্ভর করবে ম্যাচদিবসের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 

























