সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার ফলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে পড়েছে ইরান। ওই হামলায় দেশটির শতাধিক শীর্ষ নেতা ও কয়েক হাজার মানুষ নিহত হওয়ার খবর আসে এবং প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের নিহত সদস্যদের জানাজা-দাফন ঘিরে গোটা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। এই সঙ্কটের সময়ই তেহরান তাদের পারমাণবিক অবকাঠামো মেরামতের কাজ শুরু করেছে—এমন আশঙ্কাজনক তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
সিএনএন বলছে, সম্প্রতি যুক্ত হওয়া নতুন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে কয়েকটি কৌশলগত স্থাপনায় তৎপরতা বেড়েছে। বিশেষত পারচিন ঘাঁটিতে পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট: গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় পারচিনের পারমাণবিক সাইটগুলোতে যে বড় ধরনের গর্ত-ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছিল, সেগুলো এখন ভরাট ও সিল করার কাজ চলছে। প্রতিবেদন বলছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে পারচিনের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে সামরিক যানবাহন ও ট্রাকের গতি-গতিবিধিও বাড়ানো হয়েছে।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পারচিন ছিল বছরের পর বছর ধরে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক নিয়ে গোপন গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে নজরে—সেই প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত কাজেই এখন পুনরুদ্ধার শুরু করেছে ইরান। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ধ্বংস যজ্ঞের পর এই ধরনের মেরামত কাজ ও কৌশলগত পুনরায় তৈরি করাই তেহরানের অগ্রাধিকার। তবে একই সঙ্গে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে সব পারমাণবিক কেন্দ্রেই একযোগে কাজ করা হয়নি; বিশেষ করে ইসফাহান, ফোরদো, নাতানজের মতো স্থাপনাগুলোতে এখনো কোনো পরিষ্কার মেরামতির চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কার্যক্রম ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সমঝোতার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ তুলতে পারে। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতি সীমিত রাখা এবং উত্তেজনা কমানো—কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিমান হামলা ও তেহরানের মেরামতকার্য চুক্তির শর্তকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
উল্লেখ্য, সংঘর্ষের প্রাথমিক পর্যায়ে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রগুলোতে প্রবেশাধিক্য সীমিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল, ফলে বাইরের পর্যবেক্ষকদের পক্ষে ইরানের ক্ষতি এবং মেরামতের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে যখন নতুন ছবিগুলো হাতে এসেছে, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন এগুলোই প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে তেহরানের পুনর্গঠনের কৌশল।
পারমাণবিক স্থাপনার পাশাপাশি ইরান তাদের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোও সচল করতে তৎপর। প্রতিবেদন অনুযায়ী তাবরিজ ও কেরমানশাহ এলাকাভিত্তিক গোপন সুড়ঙ্গ ও আশেপাশের ধ্বংসাবশেষ দ্রুত পরিষ্কার করা হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক বিমানঘাঁটিও মেরামত করে তোলা হচ্ছে।
অন্যদিকে কূটনৈতিক স্তরে মিশ্র সংকেত দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তীকাল শেষ হয়েছে ঘোষণা দিলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথ খোলা আছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস সূত্রে খবর, সুইজারল্যান্ডে আগামী সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুনভাবে আঞ্চলিক পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানসহ কিছু মধ্যস্থতাকারী দেশ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার দরজার মধ্যস্থতায় কাজ করছে বলে বলা হচ্ছে।
তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যম ও আইআরজিসি-সংলগ্ন সূত্র এসব খবর কিছুটা উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের একটি ঘনিষ্ঠ আলোচকদল সূত্র জানিয়েছে, ইসলামাবাদে কোনো প্রস্তুত বৈঠক বা তৎপরতার বিষয়টি মিথ্যে এবং আলোচনার কোনো অগ্রগতি থাকলে তা কেবল সরকারী চ্যানেলের মাধ্যমে জানানো হবে।
সংক্ষেপে, বিদেশি স্যাটেলাইট চিত্র ও বিশ্লেষণগুলো দেখাচ্ছে—প্রচণ্ড ধ্বংসের মধ্যেও তেহরান তাদের কৌশলগত, বিশেষত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত স্থাপনা বাড়াতে বা মেরামত করতে আগ্রহী। এ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে তেহরান-ওয়াশিংটনের সমঝোতা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে, এবং ভবিষ্যৎ কৌশল ও আলোচনার ওপর নির্ভর করবে উত্তেজনা কতটা প্রশমিত হয়।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























