বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ভুলের কোনো সুযোগ নেই—এই কথাটাই সবচেয়ে ভালো বোঝে ব্রাজিল। কিন্তু হিউস্টনে জাপানের সঙ্গে রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচটি শুধু টিকিট পাকা করবার লড়াই নয়; এক বছরের পুরনো অপমানের জবাবটাই এখন সেলেসাওরাদের কাছে বড় উদ্দীপনা।
গত বছরের অক্টোবরেই টোকিওতে বসেছিল প্রীতি ম্যাচটি, যেখানে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল প্রথমার্ধে ২-০ এগিয়েছিল। অনেকেই তখন ভাবছিল সহজ জয় হবে, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে পুরোপুরি বদলে গেল চিত্র—জাপান ফিরিয়ে নিয়ে আসে ৩-২ জয়। সেই প্রতিযোগিতার স্মৃতি ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মনে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে।
এই বিশ্বকাপে অবশ্য ভিন্ন চেহারা দেখাচ্ছে ব্রাজিল। গ্রুপ পর্বে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্র করলেও এরপর টানা দুই জয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরেছে। আক্রমণে ভিনিসিয়াস জুনিয়ারের ছন্দ চমকপ্রদ; চার গোল করে তিনি দলকে বড় ভরসা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন চোটের পরে ফিরেছেন নেইমারও—তার অভিজ্ঞতা ব্রাজিলের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তবু জাপানকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। গ্রুপ পর্বে শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবলের পরিচয় দিয়ে তারা নকআউটে উঠেছে। কোচ হাজিমে মোরিয়াসু জানেন, এবার তাদের সামনে আরও ক্ষুধার্ত এক ব্রাজিল থাকবে—সেজন্যই তিনি ম্যাচের আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। কাগজে-কলমে ব্রাজিলের খেলোয়াড়ি গুণ ও বড় মঞ্চে অভিজ্ঞতা এগিয়ে রাখলেও জাপানের সংগঠন, দ্রুত প্রেসিং ও রক্ষণ থেকে আক্রমণে উঠে আসা দক্ষতা বিপজ্জনক হতে পারে।
ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে মাঝমাঠে—ব্রাজিল দ্রুত বল দখল করে উইং ব্যবহার করে আক্রমণ গড়ে তুলতে চাইবে; ভিনিসিয়াস, রায়ান বা অন্য গতিময় ফরোয়ার্ডরা যে কোনো মুহূর্তে বিপদ ডেকে আনতে সক্ষম। বিপরীতে জাপান খেলবে পজিশনাল ফুটবল, দ্রুত ট্রানজিশন ও কঠোর রক্ষণভিত্তিক চাপ দিয়ে। দীর্ঘসময় গোলশূন্য রাখলেই জাপানের জন্য অঘটন ঘটানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নেইমারের ফিটনেস নিয়েই অনিশ্চয়তা থাকায় সেলেসাওরা ঝুঁকি নিতে চাইছে না। দলের ফিটনেস স্টাফ জানিয়েছেন, নেইমারের ম্যাচ ফিটনেস এখনও পুরো ৯০ মিনিট টানার পর্যায়ে পৌঁছায়নি—তাই হেড কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাকে শুরুর একাদশে না রেখে ‘সুপার সাব’ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছেন। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্বিতীয়ার্ধে প্রয়োজন হলে মাঠে পাঠানো হতে পারে।
আরেক দুঃসংবাদ—রাফিনিয়া চোটের কারণে এ ম্যাচে নেই। উরুর চোটের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার জন্য তিনি দলের সঙ্গে না থেকে নিউ জার্সিতে থেকেই চিকিৎসা চালাবেন। তার অনুপস্থিতি আক্রমণভাগে বিষম অনুভূত হলেও দলগত গভীরতা ব্রাজিলের শক্তি ধরে রাখার আশা।
জাপানের শিবিরে ভাল খবর এসেছে—তাকেফুসা কুবো মাঠে ফিরেছেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে হাঁটুতে চোট পেয়ে তিনি মাঠ ছাড়লেও এখন পুনর্বাসন শেষে অনুশীলনে দেখা গিয়েছেন, হাঁটুতে প্রটেক্টিভ ব্যান্ডেজ থাকলেও কুবোর উপস্থিতি জাপানের আক্রমণভাগে প্রাণ জোগাবে। রিয়াল সোসিয়েদাদে খেলা কুবো দলের দু’সামনে ও মধ্যমহলে সৃষ্টিশীলতা যোগাতে পারে।
বিশ্বকাপে জাপানের ধারাবাহিক উন্নতি স্পষ্ট—গত কয়েক বছরে তারা শক্তিশালী দল হারিয়েও নেতৃত্ব দিয়েছে। সাবেক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার জিকোও বলেছেন, জাপান জিতলে তাকে অবাক মনে হবে না; মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা এখন বেশি প্রস্তুত এবং পিছিয়ে পড়ে সমতা ফেরাতে সক্ষম।
একটি ভবিষ্যদ্বাণীর কথাও আলোচনায় এসেছে—জোয়াকিম ক্লেমেন্ট দাবি করেছেন, এই রাউন্ডে ব্রাজিল জাপানের কাছে হারবে। ভবিষ্যদ্বাণী থাকুক বা না থাকুক, মাঠে যা সিদ্ধান্ত হবে তা আজকের খেলার উপরে নির্ভর করবে।
ব্রাজিল যদি জাপানকে হারায়, তাহলে শেষ ১৬-এ তাদের প্রতিপক্ষ হবে নরওয়ে ও আইভরি কোস্টের মধ্যকার জয়ী দল—আর সেখানে আর্লিং হালান্দের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ দেখা দিতে পারে। নকআউট পর্বে এখন দেখার বিষয়, ক্ষুধার্ত ব্রাজিল কীভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে, নাকি শৃঙ্খলাবদ্ধ জাপানই নতুন চমক দেখাবে।
হিউস্টন স্টেডিয়ামে আজ সোমবার রাত ১১টায় (বাংলাদেশ সময়) মাঠে গড়াবে বিগ ম্যাচটি—ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা শেষ।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 

























