১২:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
ইপিআই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্তে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী গাবতলী হাট পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রী: সড়কে কোনো চাঁদাবাজি হবে না প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা ১৭ মন্ত্রণালয়ের ৩৮টি অডিট রিপোর্ট, সংসদে উপস্থাপন করা হবে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নয়, মৌলিক অধিকার: ডা. জুবাইদা বিনিয়োগ বাড়াতে প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নবনির্বাচিত সংরক্ষিত নারী এমপিরা জিয়া ও খালেদার সমাধিতে শ্রদ্ধা বন্ধ বস্ত্র ও পাট কারখানা পুনরুজ্জীবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সাক্ষাৎ ১৬ ডিআইজি ও একজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে মনিরা শারমিনের আবেদন: নুসরাত তাবাসসুমের এমপি গেজেট প্রকাশ স্থগিত রাখার অনুরোধ

কিশোরগঞ্জ হাওরে ধানবিক্রি সংকট: কৃষক দিশেহারা

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বাজার মন্দা এবং সরকারি গুদামের কঠোর শর্তের কারণে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কষ্ট করে ঘরে তোলা ধান বিক্রি না পারায় অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি এখন নিদারুণ আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। অভিযোগ, অনেকে বাধ্য হয়ে স্থানীয় দালালদের কাছে ন্যায্য দামের অনেক কমে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযান থাকলেও তার সুবিধা সাধারণ চাষিদের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না। গুদামে ধান জমা দিতে গেলে আর্দ্রতা পরীক্ষা, ব্যাংক হিসাবের কাগজপত্রসহ নানা দাপ্তরিক বাধা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই গুদামে জমা দেয়ার আগেই ধান ফেরত আনার অতিরিক্ত পরিবহন খরচ জোগাতে না পেরে কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। এসব সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রতি মণ ধান মাত্র ৬০০–৭০০ টাকায় কিনে নিয়ে পরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছে বলে অভিযুক্ত করেছেন চাষিরা।

ইটনা উপজেলার সদরের কৃষক সুলতান মিয়া বলেন, “সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে নানা ঝামেলা। ভালো ধান নিয়ে গেলেও বলা হয় ধান ময়লা বা আর্দ্রতা বেশি। ফলশ্রুতিতে বাধ্য হয়ে দালালের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।” আরেক কৃষক মহসিন মিয়া জানান, “শ্রমিকের বেতন কাটা হয়, প্রতি মণে এক-দুই কেজি বেশি ধান নেওয়া হয়—দালালকেও দিতে হয়। সরকারের মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকার ঘোষণা আমাদের কাছে পৌঁছছে না।” লাইমপাশা গ্রামের তারু মিয়া বলছেন, “একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে ঋণের বোঝা—এই দুইয়ের চাপ সামলাতে পারছি না।” ছিলনী গ্রামের এমাদ মিয়া বলেন, “ছোট কৃষকদের সুযোগই কম দেয়া হয়; প্রভাবশালী ও বড় কৃষকরা সুবিধা পাচ্ছেন।”

প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা সমস্যা স্বীকার করলেও সরকারি নীতির বাইরে তারা তৎপর হতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। ইটনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বাবুল আকরাম জানান, “আর্দ্রতার বেশি ধান ক্রয় করা সম্ভব নয়—সংরক্ষণে ঝুঁকি থাকে। আমাদের ওপর সরকারি নির্দেশনা আছে, তাই তার বাইরের কাজ করা যায় না।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার হাওলাদার মনে করেন, ধান শুকানো না পারাই সমস্যার মূল। ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর আশ্বাস দিয়েছেন, “গুদামে যে কোনো ধরণের হয়রানির অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেছেন, “সরকার চায় কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন; অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, লটারি পদ্ধতিতে তালিকা হওয়ায় অনেক কৃষক তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন, যা অসন্তোষের কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এবার জেলায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে এবং প্রায় অর্ধলক্ষ কৃষক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ কৃষকদের দাবি অনুযায়ী ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। জেলায় মোট উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন ধান; তার বিপরীতে সরকারি ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

কৃষকরা চাচ্ছেন—সরকার সরাসরি তাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ শুরু করুক, গুদামে জমা দেয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হোক এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। নাহলে প্রান্তিক কৃষকেরা আর্থিকভাবে আরও ভীতু হয়ে পড়বেন এবং হাওরের জীবনযাত্রা টেকসইভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

গাবতলী হাট পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রী: সড়কে কোনো চাঁদাবাজি হবে না

কিশোরগঞ্জ হাওরে ধানবিক্রি সংকট: কৃষক দিশেহারা

প্রকাশিতঃ ১০:৩৮:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বাজার মন্দা এবং সরকারি গুদামের কঠোর শর্তের কারণে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কষ্ট করে ঘরে তোলা ধান বিক্রি না পারায় অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি এখন নিদারুণ আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। অভিযোগ, অনেকে বাধ্য হয়ে স্থানীয় দালালদের কাছে ন্যায্য দামের অনেক কমে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযান থাকলেও তার সুবিধা সাধারণ চাষিদের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না। গুদামে ধান জমা দিতে গেলে আর্দ্রতা পরীক্ষা, ব্যাংক হিসাবের কাগজপত্রসহ নানা দাপ্তরিক বাধা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই গুদামে জমা দেয়ার আগেই ধান ফেরত আনার অতিরিক্ত পরিবহন খরচ জোগাতে না পেরে কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। এসব সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রতি মণ ধান মাত্র ৬০০–৭০০ টাকায় কিনে নিয়ে পরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছে বলে অভিযুক্ত করেছেন চাষিরা।

ইটনা উপজেলার সদরের কৃষক সুলতান মিয়া বলেন, “সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে নানা ঝামেলা। ভালো ধান নিয়ে গেলেও বলা হয় ধান ময়লা বা আর্দ্রতা বেশি। ফলশ্রুতিতে বাধ্য হয়ে দালালের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।” আরেক কৃষক মহসিন মিয়া জানান, “শ্রমিকের বেতন কাটা হয়, প্রতি মণে এক-দুই কেজি বেশি ধান নেওয়া হয়—দালালকেও দিতে হয়। সরকারের মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকার ঘোষণা আমাদের কাছে পৌঁছছে না।” লাইমপাশা গ্রামের তারু মিয়া বলছেন, “একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে ঋণের বোঝা—এই দুইয়ের চাপ সামলাতে পারছি না।” ছিলনী গ্রামের এমাদ মিয়া বলেন, “ছোট কৃষকদের সুযোগই কম দেয়া হয়; প্রভাবশালী ও বড় কৃষকরা সুবিধা পাচ্ছেন।”

প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা সমস্যা স্বীকার করলেও সরকারি নীতির বাইরে তারা তৎপর হতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। ইটনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বাবুল আকরাম জানান, “আর্দ্রতার বেশি ধান ক্রয় করা সম্ভব নয়—সংরক্ষণে ঝুঁকি থাকে। আমাদের ওপর সরকারি নির্দেশনা আছে, তাই তার বাইরের কাজ করা যায় না।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার হাওলাদার মনে করেন, ধান শুকানো না পারাই সমস্যার মূল। ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর আশ্বাস দিয়েছেন, “গুদামে যে কোনো ধরণের হয়রানির অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেছেন, “সরকার চায় কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন; অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, লটারি পদ্ধতিতে তালিকা হওয়ায় অনেক কৃষক তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন, যা অসন্তোষের কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এবার জেলায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে এবং প্রায় অর্ধলক্ষ কৃষক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ কৃষকদের দাবি অনুযায়ী ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। জেলায় মোট উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন ধান; তার বিপরীতে সরকারি ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

কৃষকরা চাচ্ছেন—সরকার সরাসরি তাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ শুরু করুক, গুদামে জমা দেয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হোক এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। নাহলে প্রান্তিক কৃষকেরা আর্থিকভাবে আরও ভীতু হয়ে পড়বেন এবং হাওরের জীবনযাত্রা টেকসইভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।