০৫:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে: প্রতিমন্ত্রী বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই বৈশ্বিক চাপের কারণে বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে: প্রতিমন্ত্রী শারীরিক অসুস্থতা জানিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৩ লাখ টাকা জরিমানা রামিসা হত্যা-ধর্ষণ মামলার বিচার শুরু হচ্ছে কাল হজ পরবর্তী ফিরতি অভিযানে দেশে ফিরেছেন ৬ হাজার ১৭৫ জন হাজি প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে দৃষ্টিহীন নূরজাহানের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হজ শেষ: দেশে ফিরেছেন ৬ হাজার ১৭৫ জন হাজি চালুর তিন মাসে নবনির্মিত এটিসি টাওয়ার আয় ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ টাকা

ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে পানি

বিগত শতাব্দীজুড়ে জ্বালানি তেল ছিল বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির অনিবার্য চালিকাশক্তি। তেলের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই গড়া হয়েছে বড় ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক, ব্যাপক চুক্তি এবং ঘাতক যুদ্ধ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তেলের একচ্ছত্র আধিপত্য সরতে শুরু করেছে — তার জায়গা দখল করছে একটি অপরিহার্য জীবনের উপকরণ: পানি। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশুদ্ধ পানির ক্রমবর্ধমান সংকট একদিন ‘ওয়াটার রাইটস’ বা পানির অধিকারকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কৌশলবিদ আমরো জাকারিয়ার কথায়, “একবিংশ শতাব্দীতে তেলের স্থান দখল করতে যাচ্ছে পানি।” বিশ্বব্যাপী শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও কৃষির দ্রুত প্রসারে পানির চাহিদা বাড়লেও জলবায়ু পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি খরার কারণে প্রাকৃতিক জলস्रोत সংকুচিত হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রগুলো এখন পানি কেবল জনসেবার উপকরণ হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, পানির কোনো সরাসরি বিকল্প না থাকায় একবিংশ শতকের ভূ-অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এর গুরুত্ব তেলের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।

প্রযুক্তি খাতের চাহিদা পানির ব্যবহারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ লিটার অতিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন পড়ছে—যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারের দৈনিক চাহিদার সমান। সংবাদে বলা হয়েছে, বিশ্বসেরা চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি ২০২৩ সালে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ঘনমিটার পানি ব্যবহার করেছে এবং যদি প্রবণতা ধরে যায়, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাতের পানির চাহিদা দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা আছে। একইভাবে, ২০৩০ সাল নাগাদ ডেটা সেন্টারগুলোর পানির ব্যবহার ১.২ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বের মোট পানির প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা সরবরাহের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হতে পারে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট (WRI) সতর্ক করেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো চরম পানি সংকটের মুখে পড়বে। এ মুহূর্তে মূল্যায়ন করে দেখা যাচ্ছে, ২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পানি সেবা খাতের মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে—যার বড় অংশ থাকবে পানির অবকাঠামো, পরিশোধন ও রিসাইক্লিং প্রযুক্তি, এবং আর্থিক সেবা।

যদিও তেল বা স্বর্ণের মতো পানির একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক বাজার এখনও তৈরি হয়নি, তবু অনেক দেশে পানির বাণিজ্যিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকায় বছরে প্রায় ৪০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মানের পানি লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলেও কৃষি ও শিল্পের জন্য পানির পৃথক বাজার গড়ে উঠেছে—ক্যালিফোর্নিয়ায় চিপ নির্মাণে ব্যবহৃত একটি একর-ফুট পানির মান তুলনা করলে তা তুলা চাষের চেয়ে বহুগুণ বেশি আয়ে পরিণত হয়। এই পার্থক্যই পানিকে ভূমি উন্নয়ন ও অন্যান্য সম্পদের মতো মূল্যবান করে তুলছে।

পানির ঘাটতি মোকাবেলায় বিশ্বজুড়ে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিশাল বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো (GCC) পানির সেক্টরে ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে। তত্ত্বাবধানে জল সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, অপনিস্কাশন ও পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং দূরবর্তী পানির পরিবহনের মতো উদ্যোগগুলোকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এ সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে মরক্কোয় কম বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায় এবং তিউনিসিয়ায় শস্য উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পায়—ফলে এই দেশগুলোর আমদানিনির্ভরতা বাড়ে এবং স্থানীয় বাজারে চাপ পড়ে। এসব ঘটনা দেখায় জল নিরাপত্তা শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন।

অতএব আগামী দিনের বিশ্বে পানি কেবল জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদানই নয়, একক ও বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও বিবেচিত হবে। রাষ্ট্র, শিল্প ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানদের জন্য এখন প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং ন্যায়সঙ্গত পানি ব্যবস্থাপনা—নইলে বিশুদ্ধ পানিতে কণ্ঠরোধ হবে অনেক দেশের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে পানি

প্রকাশিতঃ ০২:২৪:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

বিগত শতাব্দীজুড়ে জ্বালানি তেল ছিল বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির অনিবার্য চালিকাশক্তি। তেলের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই গড়া হয়েছে বড় ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক, ব্যাপক চুক্তি এবং ঘাতক যুদ্ধ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তেলের একচ্ছত্র আধিপত্য সরতে শুরু করেছে — তার জায়গা দখল করছে একটি অপরিহার্য জীবনের উপকরণ: পানি। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশুদ্ধ পানির ক্রমবর্ধমান সংকট একদিন ‘ওয়াটার রাইটস’ বা পানির অধিকারকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কৌশলবিদ আমরো জাকারিয়ার কথায়, “একবিংশ শতাব্দীতে তেলের স্থান দখল করতে যাচ্ছে পানি।” বিশ্বব্যাপী শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও কৃষির দ্রুত প্রসারে পানির চাহিদা বাড়লেও জলবায়ু পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি খরার কারণে প্রাকৃতিক জলস्रोत সংকুচিত হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রগুলো এখন পানি কেবল জনসেবার উপকরণ হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, পানির কোনো সরাসরি বিকল্প না থাকায় একবিংশ শতকের ভূ-অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এর গুরুত্ব তেলের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।

প্রযুক্তি খাতের চাহিদা পানির ব্যবহারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ লিটার অতিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন পড়ছে—যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারের দৈনিক চাহিদার সমান। সংবাদে বলা হয়েছে, বিশ্বসেরা চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি ২০২৩ সালে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ঘনমিটার পানি ব্যবহার করেছে এবং যদি প্রবণতা ধরে যায়, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাতের পানির চাহিদা দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা আছে। একইভাবে, ২০৩০ সাল নাগাদ ডেটা সেন্টারগুলোর পানির ব্যবহার ১.২ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বের মোট পানির প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা সরবরাহের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হতে পারে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট (WRI) সতর্ক করেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো চরম পানি সংকটের মুখে পড়বে। এ মুহূর্তে মূল্যায়ন করে দেখা যাচ্ছে, ২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পানি সেবা খাতের মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে—যার বড় অংশ থাকবে পানির অবকাঠামো, পরিশোধন ও রিসাইক্লিং প্রযুক্তি, এবং আর্থিক সেবা।

যদিও তেল বা স্বর্ণের মতো পানির একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক বাজার এখনও তৈরি হয়নি, তবু অনেক দেশে পানির বাণিজ্যিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকায় বছরে প্রায় ৪০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মানের পানি লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলেও কৃষি ও শিল্পের জন্য পানির পৃথক বাজার গড়ে উঠেছে—ক্যালিফোর্নিয়ায় চিপ নির্মাণে ব্যবহৃত একটি একর-ফুট পানির মান তুলনা করলে তা তুলা চাষের চেয়ে বহুগুণ বেশি আয়ে পরিণত হয়। এই পার্থক্যই পানিকে ভূমি উন্নয়ন ও অন্যান্য সম্পদের মতো মূল্যবান করে তুলছে।

পানির ঘাটতি মোকাবেলায় বিশ্বজুড়ে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিশাল বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো (GCC) পানির সেক্টরে ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে। তত্ত্বাবধানে জল সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, অপনিস্কাশন ও পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং দূরবর্তী পানির পরিবহনের মতো উদ্যোগগুলোকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এ সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে মরক্কোয় কম বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায় এবং তিউনিসিয়ায় শস্য উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পায়—ফলে এই দেশগুলোর আমদানিনির্ভরতা বাড়ে এবং স্থানীয় বাজারে চাপ পড়ে। এসব ঘটনা দেখায় জল নিরাপত্তা শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন।

অতএব আগামী দিনের বিশ্বে পানি কেবল জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদানই নয়, একক ও বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও বিবেচিত হবে। রাষ্ট্র, শিল্প ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানদের জন্য এখন প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং ন্যায়সঙ্গত পানি ব্যবস্থাপনা—নইলে বিশুদ্ধ পানিতে কণ্ঠরোধ হবে অনেক দেশের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা।