দেশের স্বাস্থ্যখাত সবসময়ই বিরাগাভিভক্ত—এক পাশে সংকুচিত সরকারি সেবা, অন্য পাশে ঢেউ কাটানো বেসরকারি চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ। এই দুইয়ের মাঝখানে খাটাচ্ছেন কোটি মানুষ। গত কয়েক বছরে খাতটি সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়েছে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়; ২০২৫ সালে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হয়ে প্রশাসনিক অচলাবস্থা, চিকিৎসকদের অসন্তোষ এবং নীতিগত দুর্বলতাই আলোচনায় ছিল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
টিকা সরবরাহে সময়মতো ব্যর্থতার ফলে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে এবং কিছু মৃত্যুও ঘটেছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা—এসব সমস্যা একসঙ্গে তৈরি করেছে গम्भীর চিত্র। ৩৩টি জরুরি সুপারিশের মধ্যে মাত্র ছয়টি বাস্তবায়ন হওয়ায় খাতটি তীব্রভাবে আটকে পড়ে।
এই পরিস্থিতি বদলাতে বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যখাতে একটি ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) সম্প্রতি ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। সেই এডিপির মধ্যে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাখা হয়েছে ৩৫,৫৩০ কোটি টাকা, যেখানে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ১৮,১৪৮ কোটি টাকা। মোট এডিপির ১১.৮৬ শতাংশ এই খাতে বরাদ্দ রেখে স্বাস্থ্যকে তৃতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বাজেটের এই বরাদ্দের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পাবে ২৬,৮০৬ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ পাবে ৮,২২১ কোটি এবং অন্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে থাকবে ৫০৩ কোটি টাকা। সরকারের আশ্বাস, আগামীতে মোট বাজেটেও স্বাস্থ্যখাতের অংশীদারি অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
অবকাঠামো উন্নয়নে গ্রামের হাসপাতালে বড় ধরনের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের ৫০ শয্যায় ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে; এর মধ্যে আটটি ইতোমধ্যে ১০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বাকি হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত প্রয়োজন মূল্যায়ন করবে গণপূর্ত বিভাগ এবং প্রয়োজনীয় জনবলের নিয়োগ দ্রুত করা হবে। প্রতিটি হাসপাতালে আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী। গ্রামীণ পর্যায়ে থেরাপি ও পুনর্বাসন সেবা জোরদার করতে প্রতিটি হাসপাতালে দু’জন করে ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগেরও আয়োজন করা হচ্ছে।
শিশুস্বাস্থ্য সচেতনতায় দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর—এ চার বিভাগীয় শহর ও কুমিল্লা জেলা সদরে মোট পাঁচটি নতুন শিশু হাসপাতাল চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব বিশেষায়িত হাসপাতাল পূর্ণরূপে চালু করতে প্রতিটির জন্য প্রায় ১,৪৭৫ জন করে নতুন লোকবল প্রয়োজন হবে; প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দ্রুত জনবল নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
কেবল অবকাঠামো নয়, প্রশাসনিক কাঠামোতেও বড় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ ও কমিউনিটি ক্লিনিকসহ মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার কর্মী আলাদা আলাদা কাঠামোয় কাজ করছেন, ফলে একই কাজে ডুপ্লিকেশন ও সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়। উদ্দেশ্য হল মাঠ পর্যায়ের সব স্বাস্থ্য কার্যক্রমকে একক সমন্বিত কাঠামোর অধীনে এনে এই পুনরাবৃত্তি দূর করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমান ৪০ হাজার কর্মীর সঙ্গে আরও ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে—ফলশ্রুতিতে মোট কর্মী হবে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার। একীভূত ব্যবস্থায় অভিন্ন দায়িত্ববণ্টন এবং একটি মানসম্মত ‘এসেনসিয়াল সার্ভিস প্যাকেজ’ চালু করা হবে, যাতে দেশের সব প্রান্তে সেবার মানে সমতা বজায় থাকে।
নীতিগত লক্ষ্যে শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, সার্বিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয় আশাবাদী, বর্তমানে যেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গর্ভনিরোধক ব্যবহার করেন, মাঠকর্মীদের সমন্বিত প্রচারণায় তা ৭০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব।
তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ কম নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতির ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল মনে করেন, অনুকূল বাজেট হলেও বছরের শেষে সংশোধিত বাজেটে বহু প্রকল্পের বরাদ্দ কমে যেতে পারে; ফলে মাঠ পর্যায়ে সম্পূর্ণ অর্থ পৌঁছায় না। বরাদ্দ অর্থ সময়মতো ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহারই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনাহীন কাজের সমালোচনা করে বলেছেন, বর্তমান সরকার কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেবে যে বাড়তি বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যয় করা সম্ভব। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতও জানিয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ ও স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা জোরদার করে বাস্তবে কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।
যদি ৩৫ হাজার কোটি টাকার এই উন্নয়ন বাজেট এবং মাঠ পর্যায়ের কাঠামোগত সংস্কার সততা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য পকেট খালি হওয়ার বোঝা অনেকটাই কমবে। এখন দেখার বিষয়—এই ‘বাজেট ও সংস্কারের মহাসড়ক’ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না কি তা বাস্তবে জনস্বাস্থ্যের মুক্তির পথ তৈরি করে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























