সরকার দেশে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে প্রথমবারের মতো বাজারে আনছে স্বল্পমেয়াদী সুকুক। অভ্যন্তরীণ তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ২৭৩ দিনের মেয়াদে ইস্যু করা হচ্ছে ‘স্বল্পমেয়াদি বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’—এতে বিনিয়োগ শুরু করা যাবে মাত্র ১০,০০০ টাকা থেকে।
আগামীকাল রবিবার অনুষ্ঠিতব্য নিলামে অংশ নেওয়া যাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে; আবেদন সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলবে। সরকারের লক্ষ্য এই বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা। বিনিয়োগকারীদের দেওয়া হবে বার্ষিক ৯.৩৬ শতাংশ হারে এককালীন মুনাফা, যা মেয়াদ শেষ হলে মূলধনের সঙ্গে একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এটি ‘ইজারা সুকুক’ পদ্ধতিতে ইস্যু করা হচ্ছে—অর্থাৎ নির্দিষ্ট সম্পত্তির লিজ বা ভাড়াভিত্তিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে মুনাফা আদায় হবে। মেয়াদ শেষে বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল টাকা এবং ওই আয় থেকে অর্জিত মুনাফা একসাথে পেয়ে যাবেন।
বিনিয়োগক্ষেত্রটি ব্যক্তিবিশেষ, প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিভিন্ন শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠান—সবাইকে সামনে রেখে খোলা রাখা হয়েছে। আবেদন করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজেই নিলামে অংশ নেওয়া যাবে। বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘শরিয়াহ সিকিউরিটিজ মডিউল’ (এসএসএম) সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। প্রথমবার এই খাতে বিনিয়োগ করতে চাইলে ব্যাংকের মাধ্যমে একটি ‘সুকুক ইনভেস্টর (এসআই)’ আইডি খুলতে হবে; আগে থেকেই সুকুক বিনিয়োগকারী হিসেবে নিবন্ধিত থাকলে নতুন আইডির দরকার নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগ শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ সরকারি বিনিয়োগের বিকল্প তৈরি করবে এবং সরকারের স্বল্পমেয়াদী তহবিল দরকার মেটাতে সহায়তা করবে। অন্য সব সরকারি সিকিউরিটিজের মতোই এই সুকুকেও রেপো সুবিধা পাওয়া যাবে।
সুকুক কী—সংক্ষেপে: প্রচলিত সুদভিত্তিক বন্ডের বদলে সুকুক হলো কোনো নির্দিষ্ট সম্পদ বা প্রকল্পভিত্তিক অংশীদারিত্বের দলিল, যেখানে বিনিয়োগকারীরা সম্পত্তির আয়ের অংশ হিসেবে মুনাফা পান। ইংরেজিতে ‘sukuk’ আরবিভাষার শব্দ—যার অর্থ নির্দিষ্ট সম্পত্তির ওপর মালিকানার প্রমাণ। ইজারা সুকুকে সাধারণত সম্পত্তি থেকে ভাড়া আয়কে মুনাফার উৎস হিসেবে ধরা হয়।
বাংলাদেশে সুকুকের পথচলা শুরু হয় ২০২০ সালে, যখন ৮ হাজার কোটি টাকার ‘নিরাপদ পানি সরবরাহ’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম সুকুক ইস্যু করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সরকার বিভিন্ন মেয়াদের সুকুকের মাধ্যমে মোট ৪২,৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে; এর মধ্যে প্রায় ৩২,৪০০ কোটি টাকা এসেছে সরকারি নিলামের মাধ্যমে।
বিশ্বব্যাপী সুকুক এখন শক্তিশালী ও স্বীকৃত অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে গড়ে উঠেছে। মালয়েশিয়া সুকুক বাজারে শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, কাতার এবং এমনকি সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রেও এটি জনপ্রিয়। বর্তমানে সক্রিয় সুকুক বাজারের মোট মূলধন এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সংক্ষেপে, স্বল্পমেয়াদী বিজিআইএস সুকুক সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য সহজ প্রবেশদ্বার তৈরি করেছে—ন্যূনতম ১০ হাজার টাকায় নিরাপদ সরকারি প্রকল্পভিত্তিক শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগে অংশ নেওয়ার সুযোগ মিলছে, পাশাপাশি সরকারও স্বল্পকালীন তহবিল সংগ্রহে সক্ষম হবে।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























