১২:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
জ্বালানির দর বাড়লেই নিত্যপণ্যের দাম সামঞ্জস্য করা হবে: তথ্য উপদেষ্টা কারিগরি ত্রুটিতে এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, দক্ষিণ ঢাকাসহ গ্যাস সংকট বাণিজ্যমন্ত্রীর আশ্বাস: জ্বালানি দাম বাড়লেও পণ্যের মূল্য বেশি বাড়বে না তারেক রহমান: জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ, অক্ষর আমরা বাস্তবায়ন করবো সৌদি আরবের অনুরোধ: ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে দ্রুত বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রদান করা হোক দেশ-বিদেশ সফরে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য নতুন প্রটোকল ও নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনে যাত্রা শুরু করল বগুড়া সিটি করপোরেশন হাম-রুবেলা টিকা নিয়ে অবহেলা করেছিল বিগত সরকার: প্রতিমন্ত্রী টুকু তেলের দাম বাড়লেও পাম্পে দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তি দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হতে যাচ্ছেন

১০ বছর ধরে হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অন্তর হাজংয়ের সংগ্রাম

ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাঁও ইউনিয়নের লাঙ্গলজোড় গ্রামে এক আদিবাসী বাড়ির আঙ্গিনায় পাটি বিছিয়ে বসে আছে গ্রামের বিভিন্ন বয়সের মানুষ—শিশু, যুবক, বয়স্ক সবাই। তারা নিজেরাই যেন কৌতূহলে ভরে আছে। একজন কথা বলছেন, সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে। বক্তা প্রশ্ন করেছেন—চড়ুই পাখিকে হাজং ভাষায় কী বলা হয়? একে একে কেউও উত্তর দিতে পারল না। লোকজনের চোখে অনিশ্চয়তা; শেষে বক্তাই বললেন, ‘‘চড়ুইকে হাজং ভাষায় বলা হয় আংরুক।’’

বক্তার নাম অন্তর হাজং। তিনি তরুণ হলেও তার কাজের ভলুয়াম দৃষ্টিনন্দন—গত প্রায় ১০ বছর ধরে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার হাজং সম্প্রদায়ের মধ্যে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিশু ও যুবকদের হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি শেখাচ্ছেন। জন্মভূমি নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী খুজিগড়া গ্রাম। তিনি ময়মনসিংহের সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে পড়াশোনা করেছেন এবং সময় পেলেই ধোবাউড়া, হালুয়াঘাট ও দুর্গাপুরের হাজং পরিবারগুলোতে ছুটে যেতেন।

অন্তর বলেন, তার মূল উদ্দেশ্য একটাই—হাজংদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে হারানো থেকে রক্ষা করা। তিনি চান, অন্তত ঘরোয়াভাবে হাজংরা মাতৃভাষায় কথা বলুক, তাদের ছোটরা বড় হ‌ওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাতৃভাষা ভুলে না যাক। এজন্য ২০১৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে তিনি বিভিন্ন গ্রামে কর্মশালা চালিয়ে আসছেন, বয়স্কদের কাছ থেকে ভাষা ও লোকসংস্কৃতি সংগ্রহ করছেন এবং তা সংরক্ষণে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিচ্ছেন।

শুধু ভাষা শেখানোতেই তিনি থামেন না। অন্তর হাজং স্থানীয় শিশুদের জন্য বই, খাতা, কলমসহ শিক্ষাসামগ্রী নিজ বাজেট থেকে কিনে দেন। বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগে যখন দরিদ্র হাজং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয়, তখনও তিনি এগিয়ে আসেন। বহু বছর ধরে এইভাবে সকলে তাঁকে হাজং সম্প্রদায় মানুষের অকৃত্রিম বন্ধুত্বে আচ্ছন্ন মনে করেন।

তবে এত দীর্ঘ সময় কাজ করে গেলেও সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধারাবাহিক সহযোগিতা না পেয়েই চলতে হয়েছে। সেই কারণে গত কয়েক বছরে কাজের পরিধি অনেকটাই কমে এসেছে বলে সূত্রে জানান তিনি। ‘‘পরিকল্পনা ও অর্থ ছাড়া ভাষা রক্ষা করা কঠিন,’’ বলেন অন্তর।

অন্তর আরও বলেন, গ্রামের মোস্তবড় বয়স্করা এখনও তাদের মাতৃভাষা বলতে পারে, কিন্তু শহর জীবনে বড় হওয়া অনেক শিশুই এখন বাড়িতেই ভাষা ভুলে যাচ্ছে। যদি সবাই মিলে উদ্যোগ না নেই, তাহলে এই ভাষাটি হারিয়ে যেতে পারে—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।

সরকারি হিসেবে দেশে হাজং জনগণের সংখ্যা আনুমানিক ১৫ হাজার দেখানো হলেও অন্তরের অভিমত, বাস্তবে সংখ্যাটা আরও বেশি। ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ১০১টি গ্রামে হাজং পরিবার রয়েছে এবং এই তালিকাভুক্ত প্রতিটি গ্রামে কাজ করার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর। ইতোমধ্যে বেশির ভাগ গ্রামেই ঘুরে বয়স্কদের কাছ থেকে বিলুপ্ত হতে থাকা ভাষা ও সংস্কৃতির কথা সংগ্রহ করেছেন।

এই কার্যক্রমের অর্থসংকুলতাও চালায় তিনি—কিছু স্বচ্ছল হাজং পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা ও নিজের টিউশনি থেকে পাওয়া আয় দিয়ে তিনি কার্যক্রমের অনেকগুলো ব্যয়ভার একা বহন করেন। কথায় কথায় তিনি বলে ওঠেন, ‘‘আমি কোনো ভাষার বিরুদ্ধে নই; প্রত্যেকেরই উচিত তাদের মাতৃভাষার চর্চা করা। তাই আমি আজও বাড়ি বাড়ি গেলে শিশুদের ভাষা শেখাই—যতোদিন সম্ভব, কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’’

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

কারিগরি ত্রুটিতে এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, দক্ষিণ ঢাকাসহ গ্যাস সংকট

১০ বছর ধরে হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অন্তর হাজংয়ের সংগ্রাম

প্রকাশিতঃ ০৮:২৫:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাঁও ইউনিয়নের লাঙ্গলজোড় গ্রামে এক আদিবাসী বাড়ির আঙ্গিনায় পাটি বিছিয়ে বসে আছে গ্রামের বিভিন্ন বয়সের মানুষ—শিশু, যুবক, বয়স্ক সবাই। তারা নিজেরাই যেন কৌতূহলে ভরে আছে। একজন কথা বলছেন, সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে। বক্তা প্রশ্ন করেছেন—চড়ুই পাখিকে হাজং ভাষায় কী বলা হয়? একে একে কেউও উত্তর দিতে পারল না। লোকজনের চোখে অনিশ্চয়তা; শেষে বক্তাই বললেন, ‘‘চড়ুইকে হাজং ভাষায় বলা হয় আংরুক।’’

বক্তার নাম অন্তর হাজং। তিনি তরুণ হলেও তার কাজের ভলুয়াম দৃষ্টিনন্দন—গত প্রায় ১০ বছর ধরে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার হাজং সম্প্রদায়ের মধ্যে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিশু ও যুবকদের হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি শেখাচ্ছেন। জন্মভূমি নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী খুজিগড়া গ্রাম। তিনি ময়মনসিংহের সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে পড়াশোনা করেছেন এবং সময় পেলেই ধোবাউড়া, হালুয়াঘাট ও দুর্গাপুরের হাজং পরিবারগুলোতে ছুটে যেতেন।

অন্তর বলেন, তার মূল উদ্দেশ্য একটাই—হাজংদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে হারানো থেকে রক্ষা করা। তিনি চান, অন্তত ঘরোয়াভাবে হাজংরা মাতৃভাষায় কথা বলুক, তাদের ছোটরা বড় হ‌ওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাতৃভাষা ভুলে না যাক। এজন্য ২০১৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে তিনি বিভিন্ন গ্রামে কর্মশালা চালিয়ে আসছেন, বয়স্কদের কাছ থেকে ভাষা ও লোকসংস্কৃতি সংগ্রহ করছেন এবং তা সংরক্ষণে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিচ্ছেন।

শুধু ভাষা শেখানোতেই তিনি থামেন না। অন্তর হাজং স্থানীয় শিশুদের জন্য বই, খাতা, কলমসহ শিক্ষাসামগ্রী নিজ বাজেট থেকে কিনে দেন। বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগে যখন দরিদ্র হাজং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয়, তখনও তিনি এগিয়ে আসেন। বহু বছর ধরে এইভাবে সকলে তাঁকে হাজং সম্প্রদায় মানুষের অকৃত্রিম বন্ধুত্বে আচ্ছন্ন মনে করেন।

তবে এত দীর্ঘ সময় কাজ করে গেলেও সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধারাবাহিক সহযোগিতা না পেয়েই চলতে হয়েছে। সেই কারণে গত কয়েক বছরে কাজের পরিধি অনেকটাই কমে এসেছে বলে সূত্রে জানান তিনি। ‘‘পরিকল্পনা ও অর্থ ছাড়া ভাষা রক্ষা করা কঠিন,’’ বলেন অন্তর।

অন্তর আরও বলেন, গ্রামের মোস্তবড় বয়স্করা এখনও তাদের মাতৃভাষা বলতে পারে, কিন্তু শহর জীবনে বড় হওয়া অনেক শিশুই এখন বাড়িতেই ভাষা ভুলে যাচ্ছে। যদি সবাই মিলে উদ্যোগ না নেই, তাহলে এই ভাষাটি হারিয়ে যেতে পারে—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।

সরকারি হিসেবে দেশে হাজং জনগণের সংখ্যা আনুমানিক ১৫ হাজার দেখানো হলেও অন্তরের অভিমত, বাস্তবে সংখ্যাটা আরও বেশি। ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ১০১টি গ্রামে হাজং পরিবার রয়েছে এবং এই তালিকাভুক্ত প্রতিটি গ্রামে কাজ করার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর। ইতোমধ্যে বেশির ভাগ গ্রামেই ঘুরে বয়স্কদের কাছ থেকে বিলুপ্ত হতে থাকা ভাষা ও সংস্কৃতির কথা সংগ্রহ করেছেন।

এই কার্যক্রমের অর্থসংকুলতাও চালায় তিনি—কিছু স্বচ্ছল হাজং পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা ও নিজের টিউশনি থেকে পাওয়া আয় দিয়ে তিনি কার্যক্রমের অনেকগুলো ব্যয়ভার একা বহন করেন। কথায় কথায় তিনি বলে ওঠেন, ‘‘আমি কোনো ভাষার বিরুদ্ধে নই; প্রত্যেকেরই উচিত তাদের মাতৃভাষার চর্চা করা। তাই আমি আজও বাড়ি বাড়ি গেলে শিশুদের ভাষা শেখাই—যতোদিন সম্ভব, কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’’