পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে (২৬ মে থেকে ১ জুন) দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে সংঘটিত দুর্ঘটনায় সাত দিনে মোট ৯০ জন নিহত ও ১৩৫ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মাঝেই সবচেয়ে বেশি—৪১ শতাংশ—মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনা মোট ৩৫টি দুর্ঘটনায় ঘটে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সপ্তাহজুড়ে প্রাণহানির মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল ৩১ মে; আর শেষ দিনে (১ জুন) একদিনেই ১১ জন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে অনেককেই হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং অবস্থার অবনতি ঘটায় অনেকে পরে মারা গেছেন—এই সংখ্যা মূলপরিসংখ্যানেও প্রতিফলিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড়, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং মহাসড়কে মোটরসাইকেলের অতিরিক্ত চলাচল ও সার্বিক সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মিলে এই প্রাণহানির প্রধান কারণ। এছাড়া গণপরিবহনের সংকট, ভাড়া নৈরাজ্য ও নিরাপদ পরিবহনের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেলই বেছে নিচ্ছেন—অনেক সময় চালকদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ঈদের পরে প্রশাসনিক নজরদারি শিথিল হওয়াও দুর্যোগ বাড়ায় বলে জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
কয়েকটি জায়গায় ঘটনার বিবরণ মনকে ঝাকিয়ে দেয়া। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বিআরটিসির এক বাস মোটরসাইকেলকে চাপায় বাবা–ছেলের মৃত্যু হলে বিক্ষুব্ধ জনতা বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাঁশখালীতে মাছবোঝাই পিকআপভ্যান ও একটি অটোরিকশার সংঘর্ষে দুইজন নিহত হন। কুয়াকাটায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শরীয়তপুরের কিশোর জিসান নিহত হন। নাটোরে বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত কয়েকটি সংঘর্ষে চারজন প্রাণ হারান। ক্ষেতলালে আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুইজন নিহত ও একজন আহত হন—স্থানীয় রাস্তার ওপর ধান শুকাতে রাখা থাকায় নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা জানায় প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ছুটির শুরুতেই ২৬ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ শ্রমিকের মৃত্যু ছিল ছুটির সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ওই দিনই বগুড়ায় বাড়ি ফেরার পথে এক মোটরসাইকেল আরোহী ও তার চার বছর বয়সী মেয়ে নিহত হন। মিছিলের অন্যান্য দফায় বাসচাপায়, পিকআপ-ইজিবাইকের সংঘর্ষে, ও দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির পেছনে ধাক্কায় ছুটির দিনে বহু জেলায় মৃত্যুর খবর এসেছে—ঈদের দিন (২৮ মে) একমাত্র দিনে ১৮ জন নিহত হন।
দেশজুড়ে এখনও বহু ঘটনাই বড় শহর-গ্রাম মিলিয়ে ঘটেছে: কুষ্টিয়ায় যাত্রীবাহী বাস ও সেনাবাহিনীর বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত ও অন্তত ৩২ জন আহত; গাইবান্ধায় বাস খাদে পড়ে এক নারী নিহত; চাঁদপুরে বাস প্রতিযোগিতার ধাক্কায় একজন নাইটগার্ড প্রাণ হারান; ফরিদপুরে বাস খাদে পড়ে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। আরও অসংখ্য ছোট-বড় দুর্ঘটনা ছুটির প্রতিটি দিনকে কালো ছায়ায় রেখেছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বিউয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, একেবারেই ঈদকেন্দ্রিক উদ্যোগে সড়ক নিরাপত্তা টেকবে না; পুরো বছর সেফটি কালচারের চর্চা জরুরি। তিনি বলছেন, সড়কে নিয়ম মেনে চলা, চালকের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত গণপরিবহন ও রেলযোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ানো—এসব দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ ছাড়া দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা আটকানো যাবে না।
চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া দিতে জরুরি সার্বিক পরিকল্পনা, এবং উৎসবের সময়ও রোড পেট্রোলিং ও ট্রাফিক কন্ট্রোল জোরদার রাখতে autoridadesদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। রাস্তায় সাধারণ মানুষের সতর্কতা, মোটরসাইকেলে হেলমেট ব্যবহার ও গন্তব্য নির্ধারণে বেশি সচেতনতা দরকার বলেও তারা মনে করেন।
ঈদ শেষে এই সাত দিনের সংখ্যাগুলো দেশের সড়ক নিরাপত্তা তাদের দুর্বলতার খোলাসা করেছে—কেবল শোকপূর্ণ বিশ্লেষণই নয়, তা থেকে শিখে কন্ট্রোলযোগ্য নীতিমালায় দ্রুত কাজ করাই প্রয়োজন।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























