গত এক শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল জ্বালানি তেল। তেলকে নিয়ন্ত্রণ ও দখল করেই তৈরি হয়েছে বহু বড় চুক্তি, এবং তেলের জন্য সৃষ্ট টানাপোড়েনই অনেক কবে থেকেই বিধ্বংসী সংঘাতের কারণ হয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তেলের সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের জায়গায় উঠতে শুরু করেছে অন্য একটি সম্পদ: পানি।
বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ সংকট আজকের বিশ্বে এমন মাত্রায় পৌঁছতে পারে যে, ভবিষ্যতে ‘‘ওয়াটার রাইটস’’ বা পানির অধিকারই সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হবে—এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের এক বিশ্লেষণে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কৌশলবিদ আমরো জাকারিয়া বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে তেলের স্থান দখল করতে যাচ্ছে পানি।” শিল্পায়ন, কৃষি সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি ব্যবহারের পরিমাণও বাড়ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদী খরা প্রাকৃতিক পানি উৎসকে সংকুচিত করছে। এজন্য রাষ্ট্রগুলো এখন পানিকে কেবল জনসেবামূলক সাধারণ সম্পদ হিসেবে দেখছে না—একে তারা কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পানির বিকল্প না থাকায় একবিংশ শতকের ভূ-রাজনীতিতে এর গুরুত্ব তেলের চেয়েও বেশি হয়ে উঠতে পারে।
প্রযুক্তিগত উন্নতি পানির চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ লিটার অতিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারের দৈনিক পানি প্রয়োজনের সমপরিমাণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বসেরা চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি ২০২৩ সালেই প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ঘনমিটার পানি ব্যবহার করেছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাতের পানির চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এছাড়া ডেটা সেন্টারগুলোর ও বিশাল আইটি অবকাঠামোর পানির চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে; অনুমান আছে যে ২০৩০ সালের দিকে ডেটা সেন্টারগুলোর পানি ব্যবহার ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে। তবুও আজও বিশ্বের মোট পানির প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষি খাতে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা সরবরাহের সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হয়ে যেতে পারে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অনেক দেশ চরম পানি সংকটের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে পানির অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়ায় ২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পানি সেবা খাতের বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও তেল বা স্বর্ণের মতো পানির একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববাজার এখনও গড়ে ওঠেনি, তবু অনেক জায়গায় পানির বাণিজ্যিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকায় ইতোমধ্যে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের পানি লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলেও কৃষি ও শিল্পের জন্য পানি আলাদা বাজারে কেনাবেচা হয়—ক্যালিফোর্নিয়ায় চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত এক একর-ফুট পানির থেকে যে অর্থ আয় হয় তা তুলনায় কটনের চাষ থেকে অনেক বেশি। এই ধরনের আয়ভিত্তিক পার্থক্যের কারণেই পানির অধিকার এখন জমির উন্নয়নের অধিকার বা অন্যান্য সম্পদের মতোই মূল্যবান হয়ে উঠছে।
পানির কমতি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলো এই খাতে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। ইতোমধ্যে পানি সংকট বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে: ২০২৩ সালে মরক্কোয় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কৃষিপন্য উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায় এবং তিউনিসিয়ায় শস্য উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ধসে পড়ে—যা ওই দেশগুলোর আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছে।
সংক্ষেপে, পানি এখন কেবল জীবনযাপনের অপরিহার্য উপাদান নয়; এর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক মূল্য দ্রুত বাড়ছে। জল সম্পদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, স্মার্ট ব্যবস্থাপনা ও টেকসই বিনিয়োগই হবে আগামী দশকে দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 





















