আষাঢ়ের রিমঝিম বৃষ্টিতেই স্বস্তি পাওয়া কথা, কিন্তু এবার সেই বৃষ্টির আগেই এডিস মশার বিস্তার দ্রুত বেড়েছে—ফলে পুরো দেশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্ষার শুরুতেই এ মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। গবেষকরা বলছেন, শুধু ফগিং বা ছিটানো ওষুধ নয়; নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এডিসের প্রজননস্থান ধ্বংস করা এখন সবচেয়ে জরুরি। চিকিৎসকরাও দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন যাতে জটিলতা দেখা দেওয়ার আগেই রোগীকে সেবা দেওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন—যদি এখনই তৎপর, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জরুরি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে চলতি জুলাইয়ের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ জুনের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। আগামী আগস্টে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ সময়ের সুচিকিৎসা ছাড়া ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা চরম কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুধবার (১ জুলাই) প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সারাদেশে নতুন করে ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১৬৩ জন। হাসপাতালের বিভাগভিত্তিক অবস্থান অনুযায়ী আক্রান্তদের মধ্যে বরিশাল বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) মধ্যে ৪৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের বাইরে ২৭ জন, ঢাকা বিভাগের বাইরে ২৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটিতে ৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের বাইরে ১৪ জন এবং খুলনা বিভাগের বাইরে ২৪ জন রয়েছেন।
এই সময়ে ১৬১ জন রোগী হাসপাতালে থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট ছাড়পত্রপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৯৩। এ বছরে মোট শনাক্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ২৬৭—যাদের ৬২.২ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭.৮ শতাংশ নারী। এ পর্যন্ত এই বছরে ডেঙ্গু-related মৃত্যুচূপে ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সাহিত্যগত বর্ণনায় গত কয়েক মাসের বিশ্লেষণ বলছে—মে মাসে আক্রান্ত হয়েছিল ৭১৪ জন এবং মাত্র একজনের মৃত্যু হয়েছিল; পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। কিন্তু জুনে আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫,৯২৪ জন—এক মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আট গুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার চিত্র বিমানবিহ্বল। এই গাণিতিক হার তুলে ধরে যে, এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও ভাইরাসের বিস্তার জ্যামিতিক হারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিসংখ্যানগতভাবে দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে—২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে মোট আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জন। এসব তথ্য তুলে ধরে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা ও বৈজ্ঞানিক নজরদারির অভাব আজ দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, ‘‘এ মুহূর্তে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে। জুলাই ও আগস্টে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এবার ঢাকার বাইরে সংক্রমণ বেশি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’’ তিনি বলেছেন, অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে রাজধানীতে আসছেন; দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে তাঁরা পানিশূন্যতা ও প্লাজমা লিকেজের মতো জটিলতায় পড়তে পারেন। তাই জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখতে হবে যাতে সব রোগীকে রাজধানীতে আনা না হয়।
ড. কবিরুল বাশার ও অন্যান্য কীটতত্ত্ববিদরা পুনরাবৃত্তি করে বলছেন—ফগিং একমাত্র সমাধান নয়। মশার প্রজননস্থান শনাক্ত করে লার্ভা ধ্বংস করা জরুরি। এভিডেন্সভিত্তিক, লক্ষ্যনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণের ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। স্থানীয় সরকারকে মশক নিধন কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করে জোরদার করতে হবে এবং দায়িত্বশীলভাবে হটস্পট ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক এবং কীটতত্ত্ববিদরা ওয়্যার্নিং দিয়েছেন যে দেশের আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। তবে প্রকৃত সমস্যা প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা—আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের অভাব, সংক্রমণের হটস্পট ঠিক সময়ে চিহ্নিত না করা, এবং পূর্বাভাসকে মাঠপর্যায়ে গুরুত্ব না দেওয়াই এই মহাবিপর্যয়ের মূল কারণ বলে তারা উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবিত ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ সংক্ষেপে নিচে দেয়া হল:
– হটস্পট ম্যানেজমেন্ট: যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হবে, সেগুলোর চারপাশের ৫০০ গজ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ফগিং ও আলট্রা-লো-ভলিউম (ULV) স্প্রে করা।
– কার্যকর অ্যাডাল্টিসাইড: পূর্ণবয়স্ক মশা মারার জন্য মানসম্মত, ল্যাবে পরীক্ষা সাফল্য প্রমাণিত অ্যাডাল্টিসাইড ব্যবহার করা; ভেজাল বা অদক্ষ পণ্য ব্যবহার রোধ করা।
– লার্ভা ধ্বংস: লক্ষ্যমাত্রিক লার্ভাসাইড প্রয়োগসহ স্থায়ী প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করা। কেবল ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না।
– বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রস্তুতি: সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার ও সমন্বিত করা; জেলা-উপজেলা হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা।
– জনসংযোগ ও সামাজিক আন্দোলন: সাধারণ মানুষকে মতবিরোধ ছাড়াই অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা—‘৩ দিনে ১ দিন, জমা পানি ফেলে দিন’ স্লোগানটি বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে; নির্মাণাধীন ভবন, বেইজমেন্ট ও ছাদবাগান নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে।
– ব্যক্তিগত সুরক্ষা: ভোর ও বিকেলে দরজা-জানালা বন্ধ রাখা, দীর্ঘ নোটের পোশাক পরা, রাতে মশারি ব্যবহার ও শিশুদের জন্য প্রতিরোধক ক্রিম/লোশন প্রয়োগ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন—এ সময় জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে এবং সরকারকে দ্রুত, সুসংহত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে জুলাই-আগস্টে ডেঙ্গুর আঘাত শুধু সংখ্যালঘু আক্রান্তের নয়; এটি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দ্রুত পদক্ষেপ এবং সকল স্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 



















