০৮:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
ডেঙ্গু মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা: দেশে বাড়ছে আতঙ্ক ডিজিটাল অর্থনীতির চূড়ান্ত ধাপে বাংলাদেশ: বাধ্যতামূলক ‘বাংলা কিউআর’ কার্যকর সিন্দুক-পাহারা নয়, সাইবার নিরাপত্তা এখন বেশি জরুরি: তথ্যমন্ত্রী বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শ্রদ্ধাভরে শেষ বিদায় সাইবার নিরাপত্তা সিন্দুক পাহারার চেয়ে বেশি জরুরি: তথ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ বিদায় মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন অনন্য বহুমুখী শিল্পী: তথ্যমন্ত্রী নাম বদল বা তৃণমূল—কোনওভাবেই কার্যক্রম চালাতে পারবে না আওয়ামী লীগ: তথ্য উপদেষ্টা সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস — অনলাইন বেটিংয়ে সর্বোচ্চ ৫ কোটি জরিমানা, ১০ বছর কারাদণ্ড ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে: মির্জা ফখরুল

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গাজীপুরের মৃৎশিল্প

গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। সরকারি সহায়তা ও উন্নত বাজারসংযোগ না থাকায় দিন দিন মৃৎশিল্প সংকটে পড়ছে। প্রযুক্তি, ভোগবিলাস ও বাজারের বৈচিত্র্যের কারণে বহু পরিবার পৈতৃক এই পেশা ত্যাগ করে অন্য কাজে ঝুঁকে পড়েছে।

গাজীপুর জেলার সদর ও বিভিন্ন উপজেলার—কাশিমপুর, ইছর, নারগানা, রয়েন, বইন্য, নাওয়ান, গোপিনপুর, বেগুন, কামরা, কারখানা, কাপাসিয়া উপজেলার নাওয়ান, করিহাতা, আড়াল, কুড়িহাটা, শ্রীপুর, বরমী, কালীগঞ্জ, জামালপুর, পালপাড়া, রঘুনাথপুর, চাপাইর, বেনুপুর, উল্টা পাড়া, বলিয়াদি ও বাসাকৈরসহ—অসংখ্য গ্রামে এখনো যারা মৃৎশিল্পে নিয়োজিত, তাদের জীবন-যাপন ভালো নেই।

রঘুনাথপুর পালপাড়ায় দেখা যায় শিল্পীরা নিজেদের হাতে মাটির নিপুণ কারুকাজে তৈরি করছেন শিশু খেলনা, ফুলদানী, হাড়ি-কড়াই, বাসন, বাটি, চায়ের কাপ, হাতি, ঘোড়া, পাখি, মোরগ, খরগোশ, কলস, ফুলের টবসহ নানাধরনের পণ্য। মাটির কাঁচামাল সংগ্রহ, নরম করে সাঁচে দেওয়া, রোদে শুকানো ও চুলায় পোড়ানো—প্রায় সব কাজেই নারীরাই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

জেলায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কয়েক হাজার পরিবার। তারা মূলত মেলা, পূজা ও বার্ষিক উৎসবে তৈরি পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে বছরের বেশিরভাগ সময়ই কাজের অভাবে তারা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। শুধু পহেলা বৈশাখ, মেলা বা পূজার সময়ই সাময়িকভাবে চাহিদা বাড়ে এবং মাটির শিল্প যেন অল্পকালের জন্য স্বজনের গৌরব ফিরে পায়।

স্থানীয় শিল্পী ভীম পাল, গোপাল পালসহ অনেকে জানান, পরিবারগতভাবে তারা এই পেশা ধরে রেখেছেন, তবে তরুণ প্রজন্ম আজ আগ্রহী নয়; অনেকেই অন্য পেশা বেছে নিচ্ছে। কিছু পরিবার অন্য কোনো দক্ষতা না থাকায় বাধ্য হয়ে মাটির কাজ করছেন। বাজারে সস্তা প্লাস্টিক ও কলাকৃতি পণ্যের প্রতারণা, মূল্যগত চাপ ও প্রচার-প্রসারের অভাবে মৃৎশিল্পীরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না এবং লাভের মুখ দেখেনা।

বোয়ালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন খান জানান, তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃৎশিল্পীদের জন্য বিশেষ অনুদান ও সহায়তার বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করবেন। শিল্পীরা সরকারের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে এই ক্ষুদ্র শিল্প সংরক্ষণ সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

শিল্পী ও স্থানীয়রা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনগুলো চাইলে প্রশিক্ষণ, আধুনিক চুলা, বাজারজাতকরণ ও অনলাইন বিপণন শেখানোর মাধ্যমে মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখা যায়। তাছাড়া স্টলভাড়া কমানো, মেলার সুযোগ বাড়ানো ও স্থানীয় পর্যায়ে ক্রেতা-পরিচিতি গড়ে তোলা হলে ব্যাপারটা আরও সহজ হবে।

গতকালকের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা এই মৃৎশিল্প যদি সুরক্ষিত না করা হয়, তবে তা ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় লিপ্ত হয়ে যাবে। এখন সময়—উপযুক্ত নীতিমালা, আর্থিক সহায়তা ও বাজারসংযোগের মাধ্যমে বড়লোক নয়, ক্ষুদ্রশিল্পীকে পাশে দাঁড়ানোর।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

ডেঙ্গু মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা: দেশে বাড়ছে আতঙ্ক

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গাজীপুরের মৃৎশিল্প

প্রকাশিতঃ ০৭:২২:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। সরকারি সহায়তা ও উন্নত বাজারসংযোগ না থাকায় দিন দিন মৃৎশিল্প সংকটে পড়ছে। প্রযুক্তি, ভোগবিলাস ও বাজারের বৈচিত্র্যের কারণে বহু পরিবার পৈতৃক এই পেশা ত্যাগ করে অন্য কাজে ঝুঁকে পড়েছে।

গাজীপুর জেলার সদর ও বিভিন্ন উপজেলার—কাশিমপুর, ইছর, নারগানা, রয়েন, বইন্য, নাওয়ান, গোপিনপুর, বেগুন, কামরা, কারখানা, কাপাসিয়া উপজেলার নাওয়ান, করিহাতা, আড়াল, কুড়িহাটা, শ্রীপুর, বরমী, কালীগঞ্জ, জামালপুর, পালপাড়া, রঘুনাথপুর, চাপাইর, বেনুপুর, উল্টা পাড়া, বলিয়াদি ও বাসাকৈরসহ—অসংখ্য গ্রামে এখনো যারা মৃৎশিল্পে নিয়োজিত, তাদের জীবন-যাপন ভালো নেই।

রঘুনাথপুর পালপাড়ায় দেখা যায় শিল্পীরা নিজেদের হাতে মাটির নিপুণ কারুকাজে তৈরি করছেন শিশু খেলনা, ফুলদানী, হাড়ি-কড়াই, বাসন, বাটি, চায়ের কাপ, হাতি, ঘোড়া, পাখি, মোরগ, খরগোশ, কলস, ফুলের টবসহ নানাধরনের পণ্য। মাটির কাঁচামাল সংগ্রহ, নরম করে সাঁচে দেওয়া, রোদে শুকানো ও চুলায় পোড়ানো—প্রায় সব কাজেই নারীরাই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

জেলায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কয়েক হাজার পরিবার। তারা মূলত মেলা, পূজা ও বার্ষিক উৎসবে তৈরি পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে বছরের বেশিরভাগ সময়ই কাজের অভাবে তারা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। শুধু পহেলা বৈশাখ, মেলা বা পূজার সময়ই সাময়িকভাবে চাহিদা বাড়ে এবং মাটির শিল্প যেন অল্পকালের জন্য স্বজনের গৌরব ফিরে পায়।

স্থানীয় শিল্পী ভীম পাল, গোপাল পালসহ অনেকে জানান, পরিবারগতভাবে তারা এই পেশা ধরে রেখেছেন, তবে তরুণ প্রজন্ম আজ আগ্রহী নয়; অনেকেই অন্য পেশা বেছে নিচ্ছে। কিছু পরিবার অন্য কোনো দক্ষতা না থাকায় বাধ্য হয়ে মাটির কাজ করছেন। বাজারে সস্তা প্লাস্টিক ও কলাকৃতি পণ্যের প্রতারণা, মূল্যগত চাপ ও প্রচার-প্রসারের অভাবে মৃৎশিল্পীরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না এবং লাভের মুখ দেখেনা।

বোয়ালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন খান জানান, তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃৎশিল্পীদের জন্য বিশেষ অনুদান ও সহায়তার বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করবেন। শিল্পীরা সরকারের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে এই ক্ষুদ্র শিল্প সংরক্ষণ সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

শিল্পী ও স্থানীয়রা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনগুলো চাইলে প্রশিক্ষণ, আধুনিক চুলা, বাজারজাতকরণ ও অনলাইন বিপণন শেখানোর মাধ্যমে মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখা যায়। তাছাড়া স্টলভাড়া কমানো, মেলার সুযোগ বাড়ানো ও স্থানীয় পর্যায়ে ক্রেতা-পরিচিতি গড়ে তোলা হলে ব্যাপারটা আরও সহজ হবে।

গতকালকের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা এই মৃৎশিল্প যদি সুরক্ষিত না করা হয়, তবে তা ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় লিপ্ত হয়ে যাবে। এখন সময়—উপযুক্ত নীতিমালা, আর্থিক সহায়তা ও বাজারসংযোগের মাধ্যমে বড়লোক নয়, ক্ষুদ্রশিল্পীকে পাশে দাঁড়ানোর।