নরসিংদী জেলার তিনটি উপজেলা বর্তমানে ধনিয়া পাতার আবাদে এগিয়ে যাচ্ছে, যা কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করছে। প্রতি বছরই দিন দিন এর বাজার চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ছে, কারণ এই পাতা কম খরচে বেশি লাভজনক এবং এর স্বাদ, গন্ধ ও আকারে অন্যান্য ধনিয়া থেকে আলাদা। এর আগ্রহ দ্রুত বেড়ে চলেছে শিবপুর, বেলাবো ও মনোহরদী উপজেলার কৃষকদের মধ্যে, যারা এই গুণমানবহুল মসলা জাতীয় পাতা চাষ করে অসাধারণ লাভ পাচ্ছেন। এটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রবেশ্ছে, এমনকি দেশের বাইরে রপ্তানির সম্ভাবনাও বাড়ছে।
শিবপুরের জয়নগর ইউনিয়নের কৃষক জজ মিয়া (৬০) এর গল্প এভাবেই উদাহরণস্বরূপ। তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও মসলা চাষ করে আসছেন। সম্প্রতি তার ১০ শতক জমিতে বিলাতি ধনিয়া পাতা চাষ করেছেন, যার ফলস্বরূপ ইতোমধ্যে বিক্রির জন্য ৭২ হাজার টাকার পাতা বিক্রি করেছেন। তিনি আশা করছেন, আরও ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার পাতা বিক্রি হতে পারে। এই বছর তার খরচ হয়েছে ১৮ হাজার টাকা, এবং লাভের পরিমাণ অনেকটাই বেশি।
অন্য এক কৃষক, জুলেখা বেগম (৫০), ৮ শতক জমিতে এই ধনিয়া পাতার চাষ করে ৪৮ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন, এবং আরও বিক্রির জন্য আশা করছেন। তিনি বলেন, এই চাষে সার ও পানির খরচ কম, তাই খরচে লাগছে কম আর লাভ হচ্ছে বেশি।
বাজারের বিবরণ বলছে, প্রতি কেজি বিলাতি ধনিয়া পাতার দাম সাধারণত ১৫০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। এই ধরনের ধনিয়া পাতার বাজার বিশেষ করে বটেশ্বরে রয়েছে, যেখানে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অংশ থেকে পাইকারি ক্রেতারা আসেন।
স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন, সরকারের যদি বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো হয়, তবে এই পাতাকে রপ্তানি পণ্য হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। বিশেষ করে শীতকালীন মৌসুমে এর উৎপাদন বেড়ে যায়, এবং যদি সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকত, তবে এর মুনাফাও আরও বৃদ্ধি পেত।
জেলার কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর নরসিংদীতে মোট ৫৫ একর জমিতে এই ধনিয়া পাতার চাষ হয়েছে, যা ক্রমশ বাড়ছে। আকার ও গন্ধে এই ধনিয়া সাধারণ ধনিয়া থেকে ভিন্ন, আরও তীব্র ঘ্রাণ ও স্বাদে ঝাঁজালো হওয়ায় হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ঘরোয়া রান্নায় এর ব্যবহার বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই স্থানীয় উৎপাদিত ধনিয়া পৌঁছে দিচ্ছে।
ক্রেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রবণতা দেখা গেছে, যারা পাইকারি ক্রেতা, তারা এখানে এসে ধনিয়া কিনে যান। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এ বাজার গিজগিজ করছে ক্রেতা ও বিক্রেতার ভিড়ে।
বিক্রেতারা বলছেন, এখান থেকে তারা প্রতিটি কেজি ধনিয়াকে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা দরে কিনে থাকেন এবং ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। লাভের অংশ সেখানেও যথেষ্ট। আর সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ধনিয়া পাতার ভিটামিনসমূহ—এ, সি ও কেঃ – শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এটি ত্বক ভালো রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
চাষের জন্য কোনও বিশেষ প্রতিবন্ধকতা নেই বললেই চলে। সাধারণত অল্প সেচ, জৈব সার ও পরিচর্যায় এটি ভালো ফলন দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিচর্যা ও পরিকল্পনায় এক বিঘা জমিতে তিন থেকে চার লাখ টাকার ধনিয়া উৎপাদন সম্ভব। এর খরচও কম, ফলে কৃষকদের জন্য এটি একটি লাভজনক ফসল হয়ে উঠছে।
সার্বিকভাবে, বিলাতি ধনিয়া পাতার চাষ নরসিংদীর কৃষি অর্থনীতিতে নতুন ও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করছে। সরকারি সহায়তা ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি অব্যাহত থাকলে এই ফসলের সম্ভাবনা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যাপকভাবে প্রসারিত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 

























