০৯:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষঃ
বেতন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাকছুদুরের পদত্যাগ রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করলেন নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি আইন অনুমোদন: আসিফ নজরুল আজও শিক্ষার্থীদের অবরোধ: রাজধানীতে অচলাবস্থা ও জনভোগান্তি ঢাকা ওয়াশিংটনের সাথে মার্কিন ভিসা স্থগিতের বিষয়ে যোগাযোগ করছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব উপমহাদেশে এক অনন্য দৃষ্টান্ত: মার্শা বার্নিকাট প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান: তরুণদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলুন অনলাইনে প্রতারণা: ঢাকায় ৫ চীনা নাগরিকসহ গ্রেপ্তার ৮, জব্দ ৫১ হাজার সিম প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচন কেন্দ্রিক ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় জাতিসংঘের সহায়তা চেয়ে আবেদন আগামীকাল থেকে আবারও শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা: উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা

খেলাপি ঋণের সংকট কাটাতে এক দশক সময় লাগবে, জানালেন গভর্নর

দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে মোট ঋণের এক তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এই খেলাপি ঋণের সংকট কাটিয়ে তুলতে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এস.এম. মনসুর। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ ছোটখাটো কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো আর্থিক খাতকে সংকটের মধ্যে ফেলেছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর সোনারগাঁ হোটেলে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন-২০২৫-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে গভর্নর এসব কথাবার্তা বলেন।

গভর্নর উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংক ঋণের এক তৃতীয়াংশ খেলাপি, যা ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বাকি অংশের ওপর ভর করেই ব্যাংকগুলো টিকে আছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক খাতের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকলেও মোট অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং শাসনব্যবস্থায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে।

নতুন তথ্য ও শ্রেণিকরণনীতির প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। দুই বছর আগে ব্যাংক খাতে এই হার আনুমানিক ২৫% হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও আসলে সরকারি হিসাবের প্রতিবেদন ছিল মাত্র ৮%, আর এখন সেটি ৩৫% এর বেশি।

গভর্নর আশ্বাস দেন যে, আমদানি এলসি (ঋণপত্র) খোলার জন্য দেশের ডলার মজুত যথেষ্ট এবং রমজানকে সামনে রেখে পণ্য আমদানিতে কোনো ঝুঁকি নেই। গত বছরের তুলনায় ইতিমধ্যে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি এলসি খোলা হয়েছে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফলভাবে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার এখন ১২০ থেকে ১২২.৫০ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল, যেখানে অন্যান্য আঞ্চলিক মুদ্রার অবমূল্যায়ন বেশি হয়েছে।

আলোচনায় তিনি জানিয়ে দেন, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি এখন চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ঠিক হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পূর্বে বিদেশি ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ কমানোর কারণে দেশের বৈদেশিক অর্থপ্রদান কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছিল, তবে এখন তারা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে গেছে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোটামুটি ইতিবাচক। বৈদেশিক মুদ্রা আসন্ন সংকট মোকাবেলায় স্থিতিশীল রয়েছে। তবে, এখনও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার উচ্চ রাখা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে আমানতের হার প্রায় ১০% এ পৌঁছেছে, যা আরও বাড়তে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

গভর্নর প্রকাশ করেন যে, গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবেলায় প্রয়োজন শক্তিশালী আর্থিক খাত গড়ে তোলা। এই জন্য প্রয়োজন বন্ড মার্কেটের বিকাশ, শেয়ারবাজারের উন্নতি এবং বিমা খাতের শক্তিশালীকরণ। তিনি বলেন, কেবল ব্যাংকেই নির্ভর না থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বন্ড বাজারকে কাজে লাগাতে হবে। এর পাশাপাশি তিনি ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে শাসনব্যবস্থা জোরদার এবং অন্যান্য আধুনিক ব্যাংকিং সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন।

মূলত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে- বোর্ডে স্বাধীন পরিচালকের সংখ্যা বৃদ্ধি, পারিবারিক মালিকানা সীমা নির্ধারণ, আমানত বিমা স্কিমের সম্প্রসারণ (কাভারেজ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা), দেউলিয়া আইন আধুনিকীকরণ ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন। তিনি আরও জানান, পাচটি দুর্বল ব্যাংক একত্রে একীভূত করে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন বসানো হবে। পাশাপাশি, নয়টি নন-বাংলিশ্রমিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

গভর্নর আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সরকার এই সংস্কার পরিকল্পনাগুলো অব্যাহত রাখবে এবং এক শক্তিশালী, স্থিতিশীল আর্থিক খাত গড়ে তুলবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ. কে. এনামুল হক, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ. কে. আজাদ, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম এবং সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন।

ট্যাগ :
সর্বাধিক পঠিত

শেরপুরে বিএনপি নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার সিদ্ধান্ত

খেলাপি ঋণের সংকট কাটাতে এক দশক সময় লাগবে, জানালেন গভর্নর

প্রকাশিতঃ ১১:৫১:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে মোট ঋণের এক তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এই খেলাপি ঋণের সংকট কাটিয়ে তুলতে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এস.এম. মনসুর। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ ছোটখাটো কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো আর্থিক খাতকে সংকটের মধ্যে ফেলেছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর সোনারগাঁ হোটেলে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন-২০২৫-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে গভর্নর এসব কথাবার্তা বলেন।

গভর্নর উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংক ঋণের এক তৃতীয়াংশ খেলাপি, যা ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বাকি অংশের ওপর ভর করেই ব্যাংকগুলো টিকে আছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক খাতের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকলেও মোট অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং শাসনব্যবস্থায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে।

নতুন তথ্য ও শ্রেণিকরণনীতির প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। দুই বছর আগে ব্যাংক খাতে এই হার আনুমানিক ২৫% হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও আসলে সরকারি হিসাবের প্রতিবেদন ছিল মাত্র ৮%, আর এখন সেটি ৩৫% এর বেশি।

গভর্নর আশ্বাস দেন যে, আমদানি এলসি (ঋণপত্র) খোলার জন্য দেশের ডলার মজুত যথেষ্ট এবং রমজানকে সামনে রেখে পণ্য আমদানিতে কোনো ঝুঁকি নেই। গত বছরের তুলনায় ইতিমধ্যে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি এলসি খোলা হয়েছে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফলভাবে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার এখন ১২০ থেকে ১২২.৫০ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল, যেখানে অন্যান্য আঞ্চলিক মুদ্রার অবমূল্যায়ন বেশি হয়েছে।

আলোচনায় তিনি জানিয়ে দেন, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি এখন চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ঠিক হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পূর্বে বিদেশি ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ কমানোর কারণে দেশের বৈদেশিক অর্থপ্রদান কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছিল, তবে এখন তারা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে গেছে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোটামুটি ইতিবাচক। বৈদেশিক মুদ্রা আসন্ন সংকট মোকাবেলায় স্থিতিশীল রয়েছে। তবে, এখনও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার উচ্চ রাখা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে আমানতের হার প্রায় ১০% এ পৌঁছেছে, যা আরও বাড়তে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

গভর্নর প্রকাশ করেন যে, গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবেলায় প্রয়োজন শক্তিশালী আর্থিক খাত গড়ে তোলা। এই জন্য প্রয়োজন বন্ড মার্কেটের বিকাশ, শেয়ারবাজারের উন্নতি এবং বিমা খাতের শক্তিশালীকরণ। তিনি বলেন, কেবল ব্যাংকেই নির্ভর না থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বন্ড বাজারকে কাজে লাগাতে হবে। এর পাশাপাশি তিনি ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে শাসনব্যবস্থা জোরদার এবং অন্যান্য আধুনিক ব্যাংকিং সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন।

মূলত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে- বোর্ডে স্বাধীন পরিচালকের সংখ্যা বৃদ্ধি, পারিবারিক মালিকানা সীমা নির্ধারণ, আমানত বিমা স্কিমের সম্প্রসারণ (কাভারেজ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা), দেউলিয়া আইন আধুনিকীকরণ ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন। তিনি আরও জানান, পাচটি দুর্বল ব্যাংক একত্রে একীভূত করে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন বসানো হবে। পাশাপাশি, নয়টি নন-বাংলিশ্রমিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

গভর্নর আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সরকার এই সংস্কার পরিকল্পনাগুলো অব্যাহত রাখবে এবং এক শক্তিশালী, স্থিতিশীল আর্থিক খাত গড়ে তুলবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ. কে. এনামুল হক, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ. কে. আজাদ, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম এবং সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন।