রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনজুড়ে শুক্রবার ও মঙ্গলবার সংঘটিত বোমা ও ড্রোন আঘাতে কমপক্ষে ২৭ মানুষ নিহত হয়েছেন, সরকারি ও আঞ্চলিক কর্তাদের বরাত দিয়ে জানা যায়। হামলা ঘটেছে রুশ সরকারের একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঠিক কয়েক দিন আগে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝিয়ায় মঙ্গলবার এক বোমা হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আঘাতে একটি গাড়ি মেরামতের কারখানা ও কয়েকটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়; আঞ্চলিক গভর্নর ইভান ফেদোরভ জানিয়েছেন এই ঘটনায় আরও প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন। চলতি বছরে জাপোরিঝিয়ায় এটি অন্যতম সবচেয়ে বড় হামলা বলে কর্মকর্তারা বলছেন।
উত্তর-পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলের ক্রামাতোরস্কেও রুশ হামলায় ছয়জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া নিপ্রো শহরে আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন।
রাতের আঁধারে পোলতাভা ও খারকিভ অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গ্যাস কোম্পানি নাফতোগাজের সিইও সেরহি কোরেটস্কি জানান, হামলায় তাদের তিন কর্মী ও দুই উদ্ধারকর্মী নিহত হয়েছেন, ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তিনি বলেন, এটি ছিল ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইলের সমন্বিত হামলা, যার ফলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার গ্রাহকের গ্যাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে ‘নিষ্ঠুর ও অর্থহীন সন্ত্রাসী আক্রমণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। টেলিগ্রামের একটি বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘‘এগুলো কোনো সামরিক যৌক্তিকতা ছাড়াই আমাদের শহর ও গ্রামকে লক্ষ্য করছে। রাশিয়ার এই আচরণ চরম নিষ্ঠুরতা।’’
স্মর্যধারার দিন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েতদের জয় এবং মস্কোর রেড স্কোয়ারে কুচকাওয়াজ উপলক্ষে রাশিয়া ৮ ও ৯ মে যুদ্ধবিরতির কথা ঘোষণা করেছিল। এর জবাবে ইউক্রেন বুধবার মধ্যরাত থেকে একটি উন্মুক্ত বা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে রাশিয়াকে এতে সম্মতি দিতে আহ্বান জানায়, তবে মস্কো থেকে তাৎক্ষণিক সাড়া মেলেনি। রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্টিন ওই অনুষ্ঠানে রুশ প্রবীণ সৈনিক ও সামরিক বাহিনীকে প্রশংসা করেন।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাশিয়া সারাদেশে ১১টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ১৬৪টি ড্রোন হামলা চালায়। কিয়েভ থেকে আল জাজিরার সংবাদকর্মী অড্রে ম্যাকআলপাইন বলছেন, ইউক্রেন ড্রোন ভূপাতিত করতে কিছুটা সক্ষম হলেও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা তাদের নেই; তাই ঝুঁকি কমাতে ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে প্যাট্রিয়টের মতো আকাশ প্রতিরক্ষা মেয়োর কাছেই আস্থা দেখা যাচ্ছে।
পাশাপাশিকভাবে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইউক্রেনীয় হামলারও খবর রয়েছে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়ার জাঙ্কয় শহরে কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে ইউক্রেনের এক ড্রোন হামলায় পাঁচ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান সের্গেই আকসিওনভ। রাশিয়ার চুভাশ প্রজাতন্ত্রে এক ড্রোন হামলায় দুজন নিহত ও অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন, সেখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে—অহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।
রাশিয়ার লেনিনগ্রাদ অঞ্চলের কিরিশি শহরে একটি বড় তেল শোধনাগারে আগুন লেগেছে বলে গভর্নর আলেকজান্ডার দ্রোজদেনকো জানান; তিনি দাবি করেন হামলার লক্ষ্য ছিল কিনেফ তেল শোধনাগার, তবে সেখানে হতাহতের খবর নেই। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ক্রিমিয়া ও রাশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে সাত ঘণ্টার মধ্যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনের ৯৩টি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
উভয়পক্ষের এই হামলা ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় সশস্ত্র সংঘাত আবার নতুন করে তীব্র রূপ নিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এমনটাই বলছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























