জ্যৈষ্ঠের তীব্র দাবদাহে মৌলভীবাজারে এক বিশেষ মৌসুমী খাবারই এখন মানুষের কাছে প্রধান সান্ত্বনা — কচি তালের শাঁস। ওপরে ঝলসে ওঠা সূর্য, নিচে তাপতাতির্য্য বাতাসে বিরামহীন দমবন্ধ করা আবহাওয়ায় জেলা সদর, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের হাট-বাজার, রাস্তার মোড় ও পর্যটন কেন্দ্রে তালশাঁসের ভিড় বেড়েছে চোখে পড়ার মতো।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভ্যানগাড়ি ও ফুটপাতের অস্থায়ী স্টলে তালশাঁস বিক্রি চলছে। ক্লান্ত পথচারী, রিকশাচালক, অফিসগামী ও পর্যটক—সবার কাছেই কচি তালশাঁস আলপনা স্বস্তি। জেলা শহরের সিলেট রোড, শ্রীমঙ্গলের কালিঘাট ও কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া ও মাধবপুর লেকসংলগ্ন এলাকায় এসব স্টল বেশি লক্ষ্য করা যায়।
বিক্রেতারা বলছেন, বৈশাখের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় দুই মাস ধরে এই ব্যবসা চলে। গ্রামাঞ্চল থেকে সরাসরি আস্ত তাল এনে পাইকারি দরে কেটে কেটে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিক্রি করা হয়। সাধারণত একটি তালে ৩-৪টি শাঁস থাকে। খুচরা দরে প্রতি শাঁস ২০-৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে; পুরো আস্ত তাল ছোট হলে দাম প্রায় ৩০ টাকা, বড় হলে ৫০ টাকা। পাইকারি হিসাবে প্রতি পিস তাল ১০-২০ টাকায় কেনা হয়। কিছু বিক্রেতা গ্রাম থেকে গাছের ফল আকার ও সংখ্যার ওপর ভেবে ৮০০-১,০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করে কিনে আনেন।
শ্রীমঙ্গল থেকে বিক্রেতা বাবুল মিয়া জানান, ‘গরম বাড়ার পর থেকে বিক্রি অনেক বেড়েছে।’ উকিলবাড়ি রোডের বিক্রেতা জামসেদ আলী বলেন, প্রতিদিন তিনি ২০০-২৫০টি তাল বিক্রি করেন। জেলা শহরের সেন্ট্রাল রোডের আদি বিক্রেতা আব্দুস সামাদ জানান, পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে তার দৈনিক বিক্রি ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে থাকে।
পর্যটক ও স্থানীয়রা বলছেন, কৃত্রিম বা রসায়ণযুক্ত ঠান্ডাজাতীয় পানীয়ের চেয়ে প্রাকৃতিক ও সতেজ এই তালশাঁস অনেক বেশি পছন্দের। এক পর্যটক জানান, ‘গরমে প্রতিদিন তালশাঁস খাই, পরিবারের জন্যও নিয়ে যাই।’ রিকশাচালক শহিদ মিয়া বলেন, ‘দুপুরে রোদে রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত হলে দুই-তিনটা শাঁস খেলে শরীরটা অনেক ঠান্ডা লাগে, রিকশা চালাতে কর্মশক্তি ফিরে আসে।’ গৃহিণী নাজমিন আক্তার ও ব্যবসায়ী শাহেদুল ইসলামও জানাচ্ছেন, শিশুদের জন্য কৃত্রিম পানীয়ের পরিবর্তে তালশাঁস অনেক নিরাপদ মনে করেন তারা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও গরমের সময় কৃত্রিম পানীয় এড়িয়ে বেশি করে প্রাকৃতিক ফল-মূল্য গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডাক্তার সাজেদুল কবির বলেন, ‘তালের শাঁসে জলীয় উপাদান ও প্রয়োজনীয় খনিজ থাকে, যা তাপজনিত পানিশূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, এ ও বি-কমপ্লেক্স রয়েছে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, রক্তশূন্যতা কমে এবং চোখের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।’
স্থানীয় বিক্রেতারা আশা করছেন, গরম যদি কিছুদিনই বাড়ে তবে তালশাঁসের চাহিদা ও বিক্রি আরও বাড়বে। এ মৌসুমি ফল কেবল তৃষ্ণা মিটায় না, ছোট ব্যবসায়ীদের আয়ে সহায়তা করে গ্রামের অর্থনীতিকেও সুযোগ দেয়—এই গরমে তাই তালশাঁস হয়ে উঠেছে মৌলভীবাজারবাসীর ছোট এক রিফ্রেশমেন্ট এবং জীবিকানির্ভর বিকল্প।
শ্রীমঙ্গল২৪ ডেস্ক 























